জীবন থেকে নেয়া (৭) —————-

২০০৮ সালের জুলাই মাস। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার দাওয়াত পেয়ে ইংল্যান্ড পৌঁছি। উদ্দেশ্য লন্ডন ইউনিভারসিটিতে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সভায় যোগদান করা। ১২-১৮ জুলাই পর্যন্ত চলে সে সভা। তা শেষ হতেই হাতে অফুরন্ত সময় পাই। এক নিকট আত্বীয় এসে আমাকে নিয়ে গেলেন তার বাসায়। দায়িত্ব নিলেন, লন্ডন শহরকে খুব কাছে থেকে, আমাকে দেখিয়ে দেয়ার। শুরু হল আমার লন্ডন দর্শন। প্রথমেই ক্যানারী ওয়ার্ফ।

আত্মীয়ের বাসার খুব কাছেই এ স্থানটি। ৮ কি:মি: এর এ স্থানটির ব্যাপক এলাকা, এক সময় নিম্ন জলাভূমি ছিল। প্রায় পরিত্যাক্ত। আজ এটি মহিরুহ। শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, এ জায়গাটিকে তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করেছে। একসময়ের এ জলাভূমি, এখন রূপ লাবন্যের জলসুন্দরী। চারদিক লেক, পার্ক, ফুলের বাগান, বিনোদন কেন্দ্র আর পরিকল্পিত দৃষ্টি নন্দন ভবন, এলাকার রূপ রস সৌন্দর্য বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে।

এক সময়ের রুগ্ন ও প্রায় পরিত্যক্ত এ স্থানটি জেগে উঠে ১৯৮০ সালে। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লৌহমানবী খ্যাত মার্গারেট থ্যাচার। তাঁর দূরদর্শি সিদ্বান্তে জেগে উঠে ক্যানারী ওয়ার্ফ। মন্ত্রী পরিষদসহ রাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা এর উন্নয়নের বিষয়ে, ব্যাপক আপত্তি জানাল। কারণ এ এলাকা যাচ্ছে তাই। তাই উন্নয়নের জন্য এ খাতে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করা, ঠিক হবে না। কিন্তু লন্ডন শহরের ভেতরে এত ব্যাপক এলাকা, অমূল্য হয়ে থাকবে, তা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না মিসেস থ্যাচার। তিনি এককভাবেই এর ডেভেলপমেন্ট এর সিদ্বান্ত নিলেন।

মিসেস থ্যাচার, এর ভূমি উন্নয়নের জন্য একটি মহা পরিকল্পনা, জাতির সামনে প্রকাশ করেন। সে সাথে বেসরকারি উদ্যোগও আহব্বান করেন। সাড়াও মেলে ব্যাপক। একসময় পরিকল্পনামত কাজও শুরু হয়ে যায়।আর এতেই, রাষ্ট্রীয় কোন অর্থ ব্যয় ছাড়াই, এখানে গড়ে উঠলো, বিশ্বের আকর্ষনীয় বাণিজ্যিক অবকাঠামো। মিসেস থ্যাচারের সেদিনের একক সিদ্ধান্তের ফলে, এটি আজ লন্ডনের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

কি নেই এখানে। ক্যানারী ওয়ার্ফে রয়েছে যুক্তরাজ্যের তিনটি সর্ব বৃহত বাণিজ্যিক ভবন। সবচেয়ে বড়টির উচ্চতা ৭৭১ ফুট। আরো রয়েছে HSBC এর প্রধান কার্যালয়, সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এর অফিস, সুবিশাল আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেন ষ্টেশন, কানাডা স্কয়ার, ওয়েস্ট ফেরি সার্কাস, ক্যাবোট স্কয়ার, সিটি গ্রুপের কার্যালয়, আধুনিক স্কুল এবং বিনোদন কেন্দ্র।
পরিকল্পিতভাবে এলাকার উন্নয়ন ঘটায়, ৫০ হাজারেরও বেশি লোক, এখানে কর্মসংস্থান এর সুযোগ পেয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও এলাকার নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যাবস্থা বজায় থাকায়, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, এখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করছে।

যোগ্য নেতৃত্ব, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সঠিক সিদ্ধান্ত কিভাবে একটি দেশ ও জাতির উন্নয়ন ঘটাতে পারে, বৃটেনের ক্যানারী ওয়ার্ফ তারই জ্বলন্ত উদাহরণ হতে পারে। (চলবে)।

———- ———— ——————- ———————-
লেখক:   গবেষক, ঢাকাস্থ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের  সাবেক সহ- সম্পাদক ও স্টাফ রিপোর্টার। বর্তমানে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক।  চট্টগ্রামে বসবাসরত।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *