জীবন থেকে নেয়া (৮)। ——— বদরুল হায়দার চৌধুরী লিটন।

গ্রেট বৃটেনের স্মৃতিময় দিনগুলো: ব্রিক লেইন যেন এক খন্ড বাংলাদেশ।

 

 

অনেক আগে থেকেই জানতাম, লন্ডন শহরে এক খন্ড বাংলাদেশ আছে। বাংলা টাউন হিসেবেও এর ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।যার প্রকৃত নাম ব্রিক লেন। টাওয়ার হ্যামলেট এর প্রাণ কেন্দ্র ব্রিক লেন। টাউনটি বৃটেনে হলেও, এখানে সবাই বাংলায় কথাবলে। বিশেষ করে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায়। আমি বৃটেনে এসেছি, অথচ বাংলা টাউনে আসবো না, কেমন করে হয়।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিকেল ৩টার কিছু আগে রওয়ানা দেই। বাইরে রৌদ্রছায়ার চমৎকার বিকেল। আমাদের গাড়ি ভেতরেঢুকতেই, সুমিষ্ট কন্ঠের বাংলা গান, ভেসে আসছে কানে। বুঝা গেল আমরা এসে গেছি। দুধারে সারি সারি বাণিজ্যিক ভবন।এরঅধিকাংশের মালিকই  বাংলাদেশী। নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি পার্ক করে, আমরা হেটে হেটে এলাকাটি দেখতে থাকি। চমৎকার একমেল বন্ধন। কিছুক্ষণ এর জন্য মনে হল, আমি বাংলাদেশের সিলেটে আছি। দেশ থেকে এসেছি জেনে, অনেকেই বেশআন্তরিকতা দেখাল। প্রায় সকলেরই বাসা বাণিজ্যিক ভবনগুলোর পেছনে। একজন প্রবীণ এর কাছ থেকে এলাকাসম্পর্কে,জানলাম অনেক কিছু।

 

 

তিনি জানালেন, স্থানীয় ব্রিক মেকিং কোম্পানীর নাম অনুসারে এর নামকরণ হয় ব্রিক লেন। তিন শত বছর ধরে এলাকায়বসতি চলে আসছে। আস্তে আস্তে এখানে সিলেট অঞ্চলের মানুষের বসতি বাড়তে থাকে। তাদের কারনে, সুদূর লন্ডনে জায়গাটি এক খন্ড বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ পশ্চিম বঙ্গের বাইরে, বাঙ্গালীর তৃতীয় প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে ব্রিক লেন।

এখানকার বাণিজ্যিক নেমপ্লেটে, ভাষা সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত আছে বাংলা। শুধু কি তাই? বাংলাদেশীদের চেষ্টায়এখানে গড়ে উঠেছে, কবি নজরুল সেন্টার,শহীদ ভবন, বঙ্গবন্ধু স্কুল, শাহজালাল স্টেট, যমুনা কোর্টসহ আরো অনেক কিছু। জানাগেল, প্রতিবছর মহা ধুমধামে এখানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। শহীদ ভবনে মঞ্চস্থ হয়  বাংলা নাটক বাংলা কবিতার আসর।

ব্রিক লেন ব্যাপকভাবে নজরে আসে ২০০৩ সালে। যখন অক্সফোর্ড গ্র‍্যাজুয়েট বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃটিশকন্যা মনিকা আলী, এর উপর একটি উপন্যাস লিখেন। বইটি তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ব্রিক লেন বইটির জন্য মনিকা তখন, বেশ টিসাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এমন কি ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্যেও বইটি মনোনীত হয়।

সিলেটী সপ্তাদশী যুবতী  নাজনীন এর জীবনকে উপজীব্য করে এর কাহিনী আগাতে থাকে। এক বৃদ্ধ নাজনীনকে বিয়ে করে ব্রিকলেন নিয়ে আসে। এখানে সে দু কন্যা সন্তানের মা হয়। কিন্তু তার চপল যুবতী মন, বৃদ্ধের বাহুডোরে সুখী হয় না।পরিণতিতে তার অতৃপ্ত মন, করিম নামে এক দোকানীর সংগে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ভাবে এগিয়ে চলে গল্পের মর্মস্পর্শীকাহিনী।

২০০৭ সালে কাহিনীকে উপজীব্য করে একটি সিনেমাও তৈরি হয়। এতে ব্যয় হয়েছিল . মিলিয়ন ডলার। বিগ বাজেটের সিনেমাটি তখন বক্স অফিস হিট করে। আর আয় করে . মিলিয়ন ডলার। এতে নাজনীন এর নাম ভূমিকায় অভিনয়করেছিলেন, ভারতীয় অভিনেত্রী তানিষ্ঠা চ্যাটার্জি। এটি পরিচালনা করেছিলেন সারা গেভরণ। ২০০৮ সালে একযোগে ইংল্যান্ড আমেরিকায় চলচিত্রটি মুক্তি পায়। আর এতেই ব্রিক লেন বাংলাদেশের নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে। আর ভাবেই জানা গেল, বিদেশের একখন্ড বাংলাদেশকে।

 

 

লেখক:   গবেষক, ঢাকাস্থ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের  সাবেক সহসম্পাদক স্টাফ রিপোর্টার। বর্তমানে বাংলাদেশ উন্মুক্তবিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *