জীবন থেকে নেয়া (৯): গ্রেট বৃটেনে আমার স্মৃতিময় দিনগুলো – সুপার টেক্স পেয়ার বেলায়েত এর সুখ উপাখ্যান। ——— ————— ——— বদরুল হায়দার চৌধুরী লিটন।

এবার আমার গন্তব্য সাসেক্স। যেখানে বাংলাদেশী হোটেল ব্যাবসায়ী বেলায়েত, তাঁর সুখ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তিনি আমারদূর সম্পর্কের আত্মীয় হন। সে সুত্রে আগেই জানতাম, তিনি বৃটেনের একজন সফল ব্যবসায়ী। তবে এতটা সফল তা ভাবতেপারিনি।

 

আগেই ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া রেল স্টেশান থেকে ট্রেনে উঠলাম। দ্রুত গতির ইলেক্ট্রিক ট্রেনটি ক্রাউলিপর্যন্ত যেতে, সময় নিল এক ঘন্টা। এটি সাসেক্সের একটি স্টেশান, যার আশপাশে জনাব বেলায়েত তাঁর পরিবার বসবাসকরেন। বৃটিশ পার্লামেন্টের সাবেক খ্যাতিমান স্পীকার জন ক্রাউলির জন্মস্থান এটি। তাঁরই নামানুসারে স্টেশান এর নামকরণকরা হয়। স্টেশানে নেমে, এক প্রবীণ ব্যাক্তিকে জিজ্ঞেস করতেই, তিনি আংগুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিলেন। যে হোটেল তাজমহল।হাঁটা দুরত্বের মধ্যেই আছে।

তখন মধ্যাহ্ন। জনাব বেলায়েত হোটেলে নেই, তবে ফোনে যোগাযোগ হচ্ছিল। ম্যানেজার নিপু আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন।তিনি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অভিজাত হোটেলটির বিভিন্ন অংশ আমাকে দেখাতে লাগলেন। দশ মিনিট পরই তিনি আসলেন। মাঝারিগড়ন। চোখে চশমা। মাথায় আধাপাকা চুল।পোশাকে সাদামাটা। প্রথম দেখায় এক গাল হাসি দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন।। কুশলবিনিময় এর পর বললেন, চলুন বাসায় যাই। এক সাথে লাঞ্চ করবো। গাড়িতে আপনার ভাবী অপেক্ষা করছে।

গাড়িতে উঠেই পরিচয় হল, জনাব বেলায়েত এর সুন্দরী স্ত্রী সোনিয়ার সংগে। কথাবার্তায় বেশ আন্তরিক। জনাব বেলায়েতনিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। পাঁচ মিনিট পর তাঁর গাড়িটি অভিজাত হোটেল স্যাফরন এর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বললেন, এটিওআমার হোটেল। এরকম আরো একটি আছে। মোট তিনটি।

গাড়িতে বললেন, তাঁর জীবনের গদ্য। ১৯৮২ সালে আমি ফেনী থেকে ভাগ্যান্বেষণে বৃটেনে আসি। পরিবারে তখন বেশ অর্থ কস্ট।এখানে এসে হোটেল তাজমহলে চাকুরী পাই। মালিক এক সময় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কারণ হোটেলটি ভাল চলছিল না। খুব অল্পঅর্থে, আমি এটি তার কাছ থেকে কিনে নেই। শুরুতে আমি স্থানীয় ব্যাংকবীমা বিভিন্ন বাণিজ্যিক অফিসে এর প্রচারণা চালাইএবং খাদ্য সরবরাহ করি। কিছুদিনের মধ্যেই এটি দাঁড়িয়ে যায়। প্রচুর লাভ হতে থাকে। এর লাভ দিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে, এরকমআরো দুটি হোটেল চালু করি। বছরে তিনটি থেকে প্রচুর অর্থ জমা হচ্ছে। শেতাংগ বৃটিশসহ বহু বাংলাদেশী এখানে এখনকাজ করছে।

 

কথা বলতে বলতে কখন যে Beauport House- চলে আসলাম, তা বুঝতেই পারিনি।এটিই জনাব বেলায়েতের বাড়ি।সাসেক্সএর Capthorne গ্রামে বাড়িটির অবস্থান। বাড়িতো নয়, যেন রাজপ্রাসাদ। তিন একরের প্রাসাদোপম বাড়িটি তিনি ২০০৬সালে, এক শেতাংগ বৃটিশ এর কাছ থেকে, প্রায় ৫০ কোটি টাকায় কেনেন। এটি শুধু অভিজাতই নয়, ঐতিহ্যবাহীও। সে সময় ওইঅর্থে, বাড়িটি কেনার মত, কোন শেতাংগকে পাওয়া যায়নি। তাই ভাগ্যক্রমে ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি তার হস্তগত হয়।

বাড়িটিকে যতই দেখি, ততই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। কি নেই এতে।

বাড়িটির প্রবেশদ্বারেই রয়েছে, একটি সুপরিসর টেনিস কোর্ট সাজানো ফুলের বাগান। এছাড়া বাড়ির পেছনের দিকে আংগুরফলের বাগান,গ্রীন হাউজ রুম, সার্ভেন্ট রুম, আংগীনায় উঁচুনীচু ল্যান্ডস্কেপ এবং সৃজন করা বনবিথী। এসব বাড়িটিকেঐতিহ্যেময় করে তুলেছে। এর আরো বৈশিষ্ট্য আছে। বাড়িতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ সৈন্যদের করা একটি ব্যাংকার রয়েছে।এছাড়া ৫শ বছরের পুরনো একটি ইউট্রি, ৪শ বছরের পুরনো ২১টি ওকট্রি, কুকিং আপেল ট্রি, দূর্লভ রোডেড এন্ড ড্রেঞ্জোম ফুলগাছ, বাড়িটিকে মহা মূল্যবান করে তুলেছে।

দুতলা বিশিষ্ট বাড়িটির সাজও চমৎকার। হাজার স্কয়ার ফুটের বাড়িটি ভিক্টোরিয়ান প্যাটার্ন করা। একটি পাঁচ তারকাহোটেলের চেয়েও বেশী আরাম সুবিধা, এখানে রাখা হয়েছে।

জনাব বেলায়েত বললেন, রাতে তিনি বাড়ির আংগীনায় ছুটে আসা ক্ষুধার্ত বুনো হরিন খরগোশ এর চলাচল উপভোগ করেন।শীতকালে বাড়ির গাছগুলোতে পেজা পেজা সাদা বরফ জমে। তখন Beuport house অপরূপ হয়ে উঠে।

সঠিক সময়ে সঠিক অর্থ কর দেয়ায় তিনি প্রচুর সম্মানও পাচ্ছেন। বেশ বছর ধরেই তিনি, বৃটেনের সুপার ট্যাক্স পেয়ার এরমার্যাদা ভোগ করছেন।কিভাবে এত অর্থ সম্পদের মালিক হলেন? উত্তরে বললেন, নিরলস প্রচেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম আর স্বপ্ন  আমাকে আজ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

লেখক:   গবেষক, ঢাকাস্থ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের  সাবেক সহসম্পাদক স্টাফ রিপোর্টার। বর্তমানে বাংলাদেশ উন্মুক্তবিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক।  চট্টগ্রামে বসবাসরত।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *