মিডিয়ার দৃষ্টিতে এ ক্রান্তিলগ্ন এবং কমিউনিটি – ৫। ————- একান্ত সাক্ষাৎকারে – কবি আমিনা বেগম।

কবি আমিনা বেগম বার্মিংহামের সাহিত্য জগতের একটি সুপরিচিত নাম। তিনি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন মিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত, বিশেষভাবে বাংলা কাগজের সাহিত্যের পাতায় তিনি লিখেন। অনেকেই তাঁকে একজন নারীবাদী কবি হিসাবেও জানেন; তাঁর লিখনীতে স্থান পায় দেশ থেকে বিলেতে আসা নববধুদরে প্রতি পারিবারিক সহিংসতার প্রতচ্ছিবি এবং প্রতিবাদ। এ নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর কবিতাবৃত্তি অতিথিদের আবগেময়/আবগোপ্লুত করে তুলার নজিরও রয়েছে। করোনাকালে কমিউনিটির সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি কমিউনিটির সকলকে এমন জটিল সময়ে ধৈর্য ধারণকে বজায় রাখার আহবান জানান, তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ‘মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে’। করোনাকালে মিডিয়ার দৃষ্টিতে কমিউনিটির সমস্যা নিয়ে আমিনা বেগমের সঙ্গে এক আলাপচারতিা প্রশ্নোত্তর আকারে বাংলা কাগজ তুলে ধরা হলো:

১। বাংলা কাগজ (বাকা): করোনা ভাইরাস মহামারিতে সামাজিক বিপর্যস্ততা বশ্বিব্যাপী আজ লক্ষণীয়, এ বিপর্যস্ততা বা ভোগান্তি আপনার ব্যক্তিগত জীবন এবং লিখালিখির জীবনকে কিভাবে প্রভাব ফেলেছে?

আমিনা বেগম (আ বেগম): মহান আল্লাহ পাকের দরবারে সর্বপ্রথম অসীম কৃতজ্ঞতাবোধ জানাচ্ছি-এখনও স্বজনের মাঝে বেঁচে আছি বলে। কেননা এ মহামারীতে বেঁচে থাকাটাও আল্লাহর অশেষ দয়া। করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় সারা বিশ্ব আজ আতঙ্কিত। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই হতাশাগ্রস্ত।

ব্যক্তিগতভাবে আমিও অনেক আতঙ্ক নিয়ে কাজ করেছি এবং করছি। যেহেতু আমি একজন স্বাস্থ্যকর্মী তাই অন্যদের মত ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ আমার ছিলোনা বা এখনও নেই। একটু খানি সর্দি, কাশি কিংবা জ্বর অনুভব করলে বুকটা শুকিয়ে যেতো মনে হতো এই বুঝি করোনা এলো। কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ দয়া এবং অসহায়
বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের (যাদের নিজ সন্তান পর্যন্ত কাছে যেতে পারেনি) দোয়ায় এখনও সুস্থভাবে সেবা দিচ্ছি। করোনার কারণে ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় লেখালেখি তেমন একটা করতে পারছি না।

২। বাকা: আপনার কবিতায় অনেক বিষয়ের মধ্যে দেশ থেকে আসা নববধুদের ওপর সহিংসতার প্রতিচ্ছবি ও প্রতিবাদ এবং এদেশের প্রজন্মদের বাংলা শিক্ষা নিয়ে ভাবনা রয়েছে। করোনাকাল এসব সামাজিক ইস্যুর ওপর কিভাবে প্রভাব ফেলছে?

আ বেগম: আমি চাই আমাদের ছেলে মেয়েরা যেনো বাংলা ভাষার প্রতি উদাসীন না হয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বাংলা ভাষায় জ্ঞান অর্জন করে। আমরা যদি সহযোগিতা করি তবে নবপ্রজন্ম অবশ্যই বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারবে এবং লিখতে ও পড়তে পারবে। আমি মনে করি করোনা কালে যেহেতু স্কুলের পক্ষ থেকে ততটা চাপ ছেলেমেয়েদের উপর নেই, সেহেতু এই সুযোগটা আমরা এখন কাজে লাগাতে পারি।

৩। বাকা: সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে গোটা বার্মিংহামে বাঙালী সংবাদ কর্মিদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। প্রাক করোনা ভাইরাস এবং বর্তমান পরিস্থিতে সাংবাদিকতার কাজে কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন?

আ বেগম:  সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের ক্ষেত্রে বার্মিংহামের সংবাদ কর্মীদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে সেটা আমি অকপটে স্বীকার করি। তাঁরা সব সময় চেষ্টা করেন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপনের। করোনাকালীন সময়ে ও যখন সবাই প্রাণভয়ে ঘরের চার দেয়ালের ভিতর বন্দী থেকেছেন তখন আমাদের সংবাদ কর্মীরা ঝুঁকি নিয়েও নিয়মিত কাজ চালিয়ে গেছেন দক্ষতার সাথে।

৪। বাকা: কমিউনিটির সুখ-দু:খ নিয়েই সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য চর্চা; করোনা ভাইরাসের আলোকে কমিউনিটিতে কি কি নতুন সমস্যা দৃশ্যমান হচ্ছে? সবচেয়ে বৃহৎ সমস্যা কি বলে মনে আপনি মনে করেন? এবং সমাধানের সম্ভাব্য উপায়গুলো কি হতে পারে? এতে মিডিয়ার কি ভূমিকা থাকতে পারে?

আ বেগম: করোনা ভাইরাসের প্রকোপে পুরো বিশ্ব থমকে গেছে। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। স্কুল কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটিতে যেতে না পেরে ঘরে বসে বসে কেউবা এক ঘেয়ে হয়ে উঠছে আর কেউবা (ডিপ্রেশন) বিষন্ন। এটা বাবা-মায়ের জন্য একটা চরম হতাশার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে, বাড়ছে অর্থনৈতিক অস্থিরতা। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মানুষের অস্থিরতা। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। আর এ কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য মিডিয়ায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন কিংবা প্রচারনামূলক বিজ্ঞাপন চালু করতে পারে। মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে সেটা মানুষকে বুঝাতে হবে।

৫। বাকা: নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিয়ের আয়োজন করা একটি পারিবারিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। করোনার ঝুঁকি এড়াতে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রাক-করোনা এবং করোনাত্তোর কালের বিয়ের অনুষ্ঠানমালার মধ্যে কি পার্থক্য হওয়া উচিৎ?

আ বেগম:  আমরা কেউই জানি না করোনা পুরোপুরি নির্মূল হতে কত  দিন, কত মাস কিংবা কত বছর লাগবে। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকতে পারে না। যেহেতু আমাদের নতুন প্রজন্মের বিয়ের অনুষ্ঠান আমাদেরকে চালিয়ে যেতে হবে তাই সরকার প্রদত্ত নিয়ম মেনে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে একদিকে যেমন করোনা ঝুঁকি এড়ানো যাবে, অন্যদিকে তেমনি উচ্চবিত্ত বিলাসী পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে ঋণের দায়ভার মাথায় নিয়ে হিমসিম খেতে হবে না।

৬।বাকা: কালের বিবর্তনে বিলেতে বাঙালী কমিউনিটির প্রচলিত প্রথারও পরিবর্তন হচ্ছে। বিলেতের বাঙালী যুবক-যুবতীরা দেশে গিয়ে বর-কনে পছন্দ করে বিয়ে করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। আর করোনা ভাইরাস এতে আরেকটি বিপত্তির কারণ হিসেবে যোগ হলো। অনেকে মনে করেন, এতে দেশ এবং প্রবাসের মধ্যে একসময় সেতুবন্ধন মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আপনি মিডিয়া কর্মি বা সাহিত্যিক হিসাবে এ সমস্যাকে কিভাভাবে দেখছেন? আমরা অবগত যে দেশ থেকে আসা বধুরা অনেক সময় ডমেস্টিক ভায়লেন্সের শিকার হয় এবং আপনার লিখায় তার প্রতিবাদেরও প্রতিফলন রয়েছে।

আ বেগম:  সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে আমাদের কমিউনিটির অনেক প্রচলিত প্রথা। এখন আর বিলেতী যুবক-যুবতীরা দেশে গিয়ে পছন্দের পাত্র-পাত্রী খুঁজছেন না এবং বাবা-মায়েরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এর বিভিন্ন কারণ আমার কাছে লক্ষণীয়। প্রথমতঃ একজন স্বামী কিংবা স্ত্রীকে আনতে গিয়ে অনেক অর্থের প্রয়োজন যা অনেকে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। ফলে জীবন সঙ্গীকে সময়মত আনতে না পারায় অধৈর্য হয়ে সঙ্গীকে ত্যাগ করার চিন্তা করছেন। দ্বিতীয়তঃ কেউ কেউ ইংরেজী পরীক্ষা পাশ করতে পারছেন না। এখন করোনাও নতুনভাবে প্রভাব ফেলবে।

অনেকে মনে করছেন এতে দেশ ও প্রবাসের মধ্যে সেতুবন্ধন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কিন্তু আমি এটাকে বড় সমস্যা বলে মনে করছিনা। সেতুবন্ধন টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।

একজন স্বাস্থ্য কর্মী এবং দোভাষী হিসাবে নানা শ্রেণীর মানুষের সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি বাবা মায়ের চাপের মুখে রাজী হয়ে বাংলার সহজ সরল মেয়েরা বিলেতে বেড়ে উঠা ‘বাবুদের’ সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে দিশেহারা পথহারা। আমি চাই আমার লিখনীর মাধ্যমে তাদেরকে সচেতন করে তুলতে যাতে করে তারা নিজের দেশেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।

৭। বাকা: লক্ষণীয় যে, ইদানিং প্রিন্ট মিডিয়ার চেয়ে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য, এটি কমিউনিটি এবং সংবাদকর্মিদের ওপর কিভাবে প্রভাব ফেলছে?

আ বেগম: প্রিন্ট মিডিয়ার চেয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়া অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য হলেও এটা কমিউনিটি এবং সংবাদ কর্মীদের উপর প্রভাব ফেলছে। অনেক সময় মানুষ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সকল খবর সঠিক বলে মেনে না নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শুনেছি।

৮। বাকা: এ করোনাকালে ফেইস বুকের টক শো সম্পর্কে আপনার মতামত কি? এটি সমাজ বা কমিউনিটির উন্নয়নে কতটুকু ইতিবাচক বলে আপনি মনে করেন?

আ বেগম: ফেইস বুকে ‘টক শো’ সম্পুর্ণ নতুন একটা আয়োজন। করোনাকালে জনগণ যেহেতু সরাসরি টিভিতে কিংবা সভা সমাবেশে মতামত পেশ করতে পারছেন না-সেহেতু ফেইস বুকে টক্ শোর মূল্যবান মতামত পেশ করছেন এবং পুরো পৃথিবীর খবর পাচ্ছেন। একই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেশ ক’জন যোগদান করতে পারছেন। আমি অবশ্যই এটাকে ইতিবাচক মনে করি।

৯। বাকা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন করোনার প্রাদুর্ভাব একেবারে নির্মূল হবে না। প্রাক-করোনাকালে সভা-সমিতি কমিউনিটিতে সামাজিক সংযোগে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতো। সামাজিক সুসঙ্গতি বজায় রাখতে এ করোনাকালে বা উত্তরকালে কি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

আ বগেম:  সামাজিক সুসঙ্গতি বজায় রাখতে গেলে সরকারের দেয়া নীতি মেনে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে-সমাজের প্রধান ব্যক্তিগণকে নিয়ে অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে সভা সমাবেশ করা যেতে পারে। তাছাড়া বিভিন্ন মিডিয়া-কে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

১০। বাকা: করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা আমাদের কমিউনিটিকে বিশেষভাবে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা? একজন মিডিয়া কর্মির দৃষ্টিতে আপনি কি মনে করেন?

আ বেগম: করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা কেবল আমাদের কমিউনিটি নয় পুরো বিশ্বকে পঙ্গু করে ফেলেছে বলে আমি মনে করি। আর এ পঙ্গুত্ব থেকে রেহাই পেতে কতদিন লাগবে আল্লাহই ভাল জানেন।

১১। বাকা: এ করোনাকালে বিলেতে মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত সহকর্মিদের প্রতি আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি?

আ বেগম:  নিজের জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে যারা প্রতিনিয়ত আমাদের জন্য কাজ করেছেন এবং করছেন মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত সেই সহকর্মীদের পরামর্শ দেবার মত দুঃসাহস আমি রাখি না। তবে তারা বরাবরের মতই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রেরণ করবেন এবং নিজেদের নিরাপদে রাখবেন সেটা আমার প্রত্যাশা।

সবশেষে ধন্যবাদ বাংলা কাগজ-কে আমায় সুযোগ দেবার জন্য। বাংলা কাগজ দীর্ঘজীবি হউক।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *