সাইয়িদ শায়খ ফাদি : মানুষকে আল্লাহ রাসুলের পথে আকৃষ্ট করার এক অপুর্ব কারিগর

বাংলা কাগজ ডেস্ক ঃ যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের বাঙালী অধ্যুষিত ইসলামিক প্রতিষ্টান সিরাজাম মুনীরা এডুকেশন সেন্টার। হঠাৎ করে কেউ গেলে দেখবে সেন্টারের মসজিদের ঈমামের স্থানটির কাছাকাছি কোনো একজনকে ঘিরে গোল হয়ে বসে আছেন ছোটো-বড়-বুড়ো সব বয়সী মানুষ। ঐ ব্যক্তিটি সুমধুর কন্ঠে কোরান পাঠ আর চমৎকার ইংরেজী উচ্চারণে কিছু একটা বলছেন। মন্ত্র -মুগ্ধের মতো উপস্থিত সকলেই তা শ্রবণ করছেন। ষাট সত্তুরোর্ধ অনেকে কাছে বসে ঐ স্থানটিতে আবর্তিত হয়ে কোরাণ পড়ছেন আর শুদ্ধভাবে কোরাণ শিখছেন তাঁর কাছ থেকে। এরম াঝে অনেক তরুনকে দেখা যায় মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনের আলোকে হাদিসের বর্ণণা শুনছেন ঐ একই ব্যক্তির কাছ থেকে। তিনি শিশু কিশোরদের সাথে একেবারে আহ্লাদি আচরণে অনেকটা বন্ধুর মতোই শিখাচ্ছেন তাদের ভবিষ্যত জীবন আলোকিত করতে নবী রাসুলের জীবনাদর্শ। যে ব্যক্তিটিকে ঘিরে সকলের এই আবর্তন তাঁকে যে কেই দেখলেই মনে হবে আপদমস্তক একজন নুরাণী চেহারার মানুষ। যার কথাটি এখানে উল্লেখ করা হলো,তিনি হলেন সিরিয়ান বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বসবাস করা সাইয়িদ শায়খ ফাদি জুবা ইবনে আলি আল হাসানি। হাদিসের বর্ণনাকারীদের সনদসহ প্রায় ১০ হাজার হাদিস মুখস্থ থাকা এই ব্যক্তিটি একেবারে নিরহংকার সাদামাঠা জীবন যাপন করেন। যে কেউ যে কোনো মুহুর্তে কোনো পুর্ব অনুমতি ছাড়া তাঁর সাথে দেখা করতে পারেন।

সদালাপি বন্ধুবৎসল হয়ে সবার সাথে সহজে মিশতে পারার এই মাণুষটি খুব অল্প বয়সে পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করে বর্তমান সময়ের বিখ্যাত সব ইসলামিক চিন্তাবিদ ও জ্ঞানীজনদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তাঁর প্রথম জীবনের শিক্ষক ছিলেন দামেস্কের বিখ্যাত আবু নুর বিশ^বিদ্যালয়ের শায়খ উমার সাববাগ। তিনি শায়খ রজব দীপ (রঃ),শায়খ মোস্তফা আলকিন (হাফি ঃ),শায়খ বাশির আলবানি,শায়খ রতিব নাবুলসি (হাফিঃ),শায়খ রামাদ্বান আল বুতি (রহঃ) এর নিকট আলাদাভাবে চার মজহাবের ফিকহ চর্চা করে ফিকহ শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেছেন। সাইয়িদ শায়খ ফাদি জুবা ইবনে আলি আল হাসানি দামেস্কের বিখ্যাত মধফাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্কলার শায়খ আব্দুর রাজ্জাক হালাবি (রহঃ) এর কাছ থেকে ক্বেরাতের শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তিতে শায়খ আব্দুর রাজ্জাক হালাবি (রহঃ) তাঁকে ইমাম হাফসের কিরাতের ইজাযত প্রদান করেন। সতেরো বছর বয়সে তিনি আধ্যাত্মিক বিদ্যার্জনে সিরিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি ও আধ্যাত্মিক শায়খ আহমদ কাফতারুর সাহচার্যে যান এবং সেখানে আট বছর তালিম-তরবিয়ত গ্রহণ করে শায়খ আহমদ কাফতারু ছাড়াও শায়খ রজব দীপ (রাহিঃ) এর সহবতে থেকে নকশেবন্দি,মুজাদ্দেদি ও খালিদি তরিকার শিক্ষা গ্রহণ করেন।

সাইয়িদ শায়খ ফাদি জুবা ইবনে আলি আল হাসানি সিরিয়ার একটি সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারের সন্তান। তাঁর দাদা হাজার হাজার আলেম-উলামার শিক্ষক মরহুম আল্লামা শায়খ বদর উদ্দিন আল হাসানি ছিলেন তৎকালিন সিরিয়ার বড় বুযুর্গ ও মুজাদ্দিদ। তাঁর বাবাও ছিলেন শায়খ মাহমুদ রংকৌসি,শায়খ সাইয়্যিদ মক্কি আল কাত্তানী (রহঃ) এর মতো ওলি আউলিয়া ও বিদ্বান ব্যক্তিদের সহবতপ্রাপ্ত। বর্তমানে সিরিয়াতেই থাকা শতবছর বয়সী তাঁর বৃদ্ধা মা অত্যন্ত ধর্মপরায়ন একজন মহীয়সী নারী। তিনি হাদিস মুখস্থ করেন শায়খ নূর উদ্দিন ইতর (রাহিঃ) এর নিকট হতে।
সিরিয়ার জনগণের উপড় প্রচন্ড প্রভাব থাকা সাইয়িদ শায়খ ফাদি জুবা ইবনে আলি আল হাসানি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে দেশ ত্যাগ করেন। সিরিয়ায় থাকাকালীন তার দরসে নিয়মিতই ৪/৫ হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত হতো, ইলিম অর্জন করতে অনেক আলেম-উলামারাও তার নিকট আসতেন। দামেস্কের অনেক বড় বড় মুফতিরাও ফিকহের জটিল বিষয় নিয়ে তাঁর স্মরণাপন্ন হতেন।

দামেস্কের একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ডিগ্রিপ্রাপ্ত সাইয়িদ শায়খ ফাদি জুবা ইবনে আলি আল হাসানি মাত্র বছর দুয়েক আগে বার্মিংহামের সিরাজাম মুনীরা ইসলামিক এডুকেশন সেন্টারে প্রিন্সিপাল ও খতিব হিসেবে যোগ দেন। আর মূলতঃ তার এই যোগ দেওয়ার পর পরই মাত্র বছর তিন চারেক আগে প্রতিষ্টিত প্রতিষ্টানটি যেনো আলোকিতই হয়ে উঠে। তাফসির,হাদিস, ফিকহ ও ইলমে কিরাতে পারদর্শী ইসলামিক বিষয়ে অত্যন্ত বিদ্বান এই ব্যক্তিটির পরশেই এই প্রতিষ্টান এখন স্থানীয়রা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন শহরের মুসলমানদের পদচারনায় মূখরীত হয়ে উঠেছে। তাঁর মনোমুগ্ধকর আলোচনায় আগতদের মাঝে দ্বীনি জ্ঞানের বিষয়ে আগ্রহী করে তুলছে। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা ছাড়াও তাঁর বুখারি শরীফের দরসে থাকেন ইয়েমেন,সোমালিয়া,পাকিস্তান,আফগানিস্তান,তুরস্ক,সিরিয়া,পাকিস্তানের মুসলমানরাও। তিনি করোনাকালীন লকডাউনের মধ্যেও অনলাইনে বিশে^র বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করছেন। শিশু, যুবক,মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধ সকলের কাছেও তিনি তাঁর ইলিমের কারণে সমান জনপ্রিয়। দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত হতে প্রতিদিন শত শত মানুষ তাঁর কাছে আসেন। তিনিও প্রতিদিনই ক্লান্তিহীনভাবে নানা বিষয়ে আলোকপাত করে কোরান ও সুন্নাহর বিষয়ে সবাইকে বেশী বেশী করে আগ্রহী করে তুলছেন। তাঁর কারণে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী শুনে অনেকেই এখন আমল করার চেষ্টা করছেন। তাঁর পেছনে জুমার নামাজ আদায় ও সমসাময়িক শিক্ষনীয় খুতবা শুনতে দূর-দুরান্ত থেকে অসংখ্য মুসল্লি জুমার নামাজে এসে শরীক হোন। শুধু ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষই নন,সাধারণ মুসল্লিরাও তার নিকট বুখারি শরিফের হাদিস শ্রবন করছেন। অনেকে প্রথম থেকে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতও শিখছেন। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও তিনি প্রতি ওয়াক্ত নামাজ শেষে মুসল্লিদের জরুরি মাসয়ালা-মাসায়েল শিক্ষা দেন। ওয়াজ ও নসিহত করে আল্লাহর পথে মানুষকে ধাবিত করতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কমিউনিটির অনেক প্রতিষ্টিত ব্যবসায়ী ও বয়োঃবৃদ্ধরাও তার সংস্পর্শে এসে অনেকেই কুরআন শরিফ পড়া সম্পন্ন করেছেন এবং নিয়মিত কুরআন শিখার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

ইসলামিক সর্ব বিষয়ে অত্যন্ত পারদর্শী এই ব্যক্তিটি বর্তমান সময়ের একজন প্রখ্যাত আলেম ও বুজুর্গ। তাঁর চলা ফেরা আচার আচরণ দেখেও অনেকে আকৃষ্ট হচ্ছেন,অনুধাবন করছেন ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবন যাপনের নানা বিষয়াদি। যথেষ্ট সুযোগ এবং বিভিন্ন লোভনীয় অফার পেয়েও একমাত্র আল্লাহ ও তার দ্বীনের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখে পার্থিব জীবনের অনেক কিছুই এই বুজুর্গ ব্যক্তি সহজেই দুরে ঠেলে দিতে পারেন। আল্লাহ মানব জাতিকে সৃষ্টিই করেছেন তাঁর প্রশংসা ও সেজদা করে ইহকালের ক্ষনিকের জীবনের চাইতে পরকালের দীর্ঘ জীবনের সঞ্চয় করার জন্য উল্লেখ করে সাইয়িদ শায়খ ফাদি বলেন, স্বাভাবিক জীবন যাপন করে সর্বদা ইবাদত বন্দেগীকরেত হবে। আল্লাহকে চিনতে হলে জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। আর জ্ঞানর্জনের জন্য শায়খদের নিকট গেলে তারা তাকওয়ার শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহ পর্যন্ত পৌছানোতে সাহায্য করেন। তিনি বলেন কোনো স্বার্থ ছাড়া মানুষকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসতে হবে।

উল্লেখ্য, সাইয়িদ শায়খ ফাদি জুবা ইবনে আলি আল হাসানি গত বছর বার্মিংহামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সিরাজাম মুনীরা ইসলামিক এডুকেশন সেন্টারের অন্যতম পরিচালক আলহাজ মাহবুবুর রহমান চৌধুরী রুহেলের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশে তিনি হযরত শাহজালাল (রঃ), শাহ পরান (রঃ), শাহ মোস্তফা (রঃ) ও আল্লামা ছাহেব ক্বিবলাহ ফুলতলী (রাঃ) এর মাজার জিয়ারত করা ছাড়াও বিভিন্ন ইসলামিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *