সিলেটের সাবেক মেয়র বদরুদ্দিন কামরান স্মরনে বাংলা কাগজের বিশেষ ক্রোড়পত্র__________ আমাদের কামরান

একজন ‘বিনয়ী কামরান’ ও কিছু স্মৃতি

মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ

সরকারি মুরারী চাঁদ কলেজে সম্মান প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে বসবাসের উদ্দেশ্যে সিলেট শহরে প্রথম পা রাখি ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তবে সে সময়ে নিয়মিত থাকা হয়ে উঠেনি। মাঝেমধ্যে এসে দু্’চার দিন হাজিরা দিয়ে আবার চলে যেতাম। ২০০১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে আবাসিক ছাত্র হিসেবে ছাত্রাবাসে উঠার পর থেকে সিলেটে নিয়মিত অবস্থান শুরু করি। পরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সহপাঠী কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিলে ছাত্রাবাস থেকে ‘সিঁড়ি’ নামক একাট সাহিত্য সাময়িকি প্রকাশ করা হয়। সাময়িকির জন্য বাণী সংগ্রহ ও সিটি কর্পোরেশনের বিজ্ঞাপন আনতে বন্ধু বিএম আবুলকে (বর্তমানে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, রূপালী ব্যাংক, সুনামগঞ্জ কর্পোরেট শাখা) সঙ্গী করে এক সকালে হাজির হই তৎকালীন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের বাসায়। তার বিনয়, সদাচরণ ও সদালাপী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকে আগে থেকে অবগত হলেও এটাই ছিল তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ।ছাত্রাবাসের অনেকেই এমনকি আমাদের এই উদ্যোগের সাথে জড়িত অন্য বন্ধুরাও পরামর্শ দিয়েছিল যেহেতু আমাদের সাথে তার কোন পূর্ব পরিচয় নেই তাই উনার সাথে সম্পর্কীত কারো মাধ্যম হয়ে যেন আমরা দেখা করি। তাদের সেই পরামর্শ কর্ণপাত না করে আমরা সরাসরি চলে যাই। আমরা যখন পৌঁছাই তখনো তিনি বৈঠকখানায় আসেননি। অথচ এরইমধ্যে অনেক মানুষের সমাগম হয়ে গেছে।

শয়নকক্ষে বসে নৈশকালীন পোশাক পরেই তিনি সবার আবদার পূরণ করছিলেন। পরিচয় দিয়ে আমাদের বিষয়টি উত্থাপন করলে তিনি খুব খুশি হয়ে আমাদেরকে এমন উদ্যোগ নেয়ার জন্য অভিবাদন জানান। অনেককেই এ ধরনের সহায়তা করতে বিধায় আমাদের দাবীর অর্ধেক পরিমাণ আর্থিক সহায়তা অনুমোদন করে কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জমা দেয়ার অনুরোধ জানান। আর মেয়রের বাণী লেখার দায়িত্ব বর্তান আমাদের ওপর। চা পান না করিয়ে আসতে দেননি। সম্পূর্ণ অপরিচিত আমাদের সাথে এমন আন্তরিক আচরণ একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল। আমরা যখন চায়ের অপেক্ষায় সে সময়ে হাতে লেখা একটি আবেদনপত্র নিয়ে হাজির হন এক বয়স্কা মহিলা। গায়ের পরিধেয় জানান দিচ্ছিল নিম্নবিত্ত পরিবারের সাধারণ একজন। ‘মা’ সম্বোধন করে মেয়র মহোদয় জানতে চান তার সমস্যার কথা। মহিলা হাতের আবেদনপত্রটি দিয়ে তাতে সুপারিশের অনুরোধ করেন। পত্র পড়ে মেয়র সঠিকভাবে লেখা হয়নি মন্তব্য করে তাকে বসার অনুরোধ জানান। মহিলা অল্পক্ষণ পরে চলে যান। কিছুক্ষণ পরেই মহিলাকে না দেখে তার লোকদেরকে তাকে খুঁজে আনার নির্দেশ দেন। তাদের একজন উনাকে রাস্তা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। পুনরায় তাকে ‘মা’ সম্ভোধন করে মেয়র জানতে চান তিনি কেন চলে যাচ্ছিলেন। প্রতিত্তোরে মহিলা বলেন, আবেদনপত্র ঠিক হয়নি বলে তিনি স্বাক্ষর না করায় ফিরে যাচ্ছিলেন। মেয়র উত্তর দেন আবেদন সঠিক হয়নি বলেছি; কিন্তু ফিরে যেতে বলিনি। অতঃপর, তার সহকারীকে ডেকে আবেদনটি সঠিকভাবে লিখে দেবার নির্দেশ প্রদান করেন। পুরো ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখে মনে হয়েছে, একজন সিটি মেয়র তার কোন নাগরিকের সাথে নয়, যেন কথা বলছেন জননীর সাথে। ফিরতি পথের পুরোটাই এই ঘটনাটি নিয়ে আমরা বিশ্লেষণ করেছি। অনেক সময় গ্রামের একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের সাথেও সাধারণ জনগণ এতটা কাছ ভীড়তে পারে না। অথচ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন হয়েও তার দ্বার ছিল সবসময় সবার জন্য উন্মুক্ত।পরবর্তীতে ছাত্রাবাসে থাকাবস্থায় সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে অনেকবার তার বাসা ও নগরভবনে যাওয়া হয়েছে। ছাত্র জীবন শেষে সিলেটে প্রায় অর্ধদশক সাংকাদিকতাকালে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বহুবার তার সাথে সাক্ষাত হয়েছে। সর্বদা তার বিনয়ী স্বভাব, সদাচারণে মুগ্ধ হয়েছি।

সিলেটের সাংবাদিক মহলে উল্লেখযোগ্য সব রাজনৈতিক দলের অনুসারী রয়েছেন। রাজনৈতিক নেতা কিংবা নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে সাংবাদিকের অনেকে বদর উদ্দিন কামরানের বিরোধী হলেও ব্যক্তি কামরানের বিরোধী কেউ ছিলেন না। একইভাবে নগরবাসীর অনেকেই রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তার প্রতিপক্ষ হলেও ব্যক্তি কামরানের কোন প্রতিপক্ষ ছিলো না। অমায়িক আচরণ, সদালাপ, বিনয় আর ভদ্রতার আভরণে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন সমগ্র সিলেটবাসীকে। তাই নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের হলেও মানুষ হিসেবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘জনতার কামরান’।বদর উদ্দিন কামরান মহান জীবনই গঠন করে গেছেন, যার ফলে গোটা সিলেটবাসী আজ তার শোকে মুহ্যমান। দল, মত, জাতি, ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই তার প্রয়াণে কাতর। মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে আকুল আবেদন মানুষ হিসেবে বদর উদ্দীন কামরানের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো গাফফার নামের খাতিরে মার্জনা করে তিনি যেভাবে মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন, এভাবে পরলৌকিক জীবনে ক্ষমাশীল আল্লাহ যেন তাকে আপন করে জান্নাতের অতিথি হিসেবে গ্রহণ করে নেন।

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব

 

 

 

দুলাভাইকে নিয়ে আড্ডা হলো না

শেবুল চৌধুরী

বাংলা কাগজের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াদ আহাদের তাগিদ দীর্ঘ দিন পর (লক ডাউনে’র কারণে) বাংলা কাগজ প্রকাশিত হচ্ছে লিখা দিতে হবে। সম্পাদক আরো জানালেন, সদ্য প্রয়াত সিলেটের সাবেক মেয়র বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইকে নিয়ে কিছু স্মৃতি চারণ করতে। উদ্যোগটা খুবই ভালো। তবে, বিশ্ব মহামারী করোনা ভাইরাসে সারা পৃথিবীর সব কিছু যেখানে উলট-পালট হয়ে আছে; সেখানে কি আর লিখবো ? তাও আবার বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইকে নিয়ে। কি লিখবো না লিখবো তা ভেবে ভেবে চলে গেলো কয়েকটি ঘন্টা । কারণ মৃত্যু তাপবাহী যন্ত্রণা নিয়ে বিগত কয়েক মাস যাবৎ আমরা আতংকের ভিতর দিয়ে দিন কাটাচ্ছি ,আতংকের রেশ এখন ও কাটে নাই। ফেব্রুয়ারী মাস থেকেই শুরু হলো করোনার ভয়ংকর তান্ডব। করোনা’র সিম্টম নিয়ে আমি নিজেও প্রায় দুই মাস (মার্চ-এপ্রিল) খুবই অসুস্থ ছিলাম। মহান আল্লাহ্ তালার অশেষ রহমতে আজ আমি লিখতে পারছি ,যা ঐ সময় কল্পনা ও করতে পারিনি। করোনা’র এই ভয়াল ছোবলে শুধু আমি নয়, আমার অনেক নিকট আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই আক্রান্ত হয়েছিলেন ।করোনার সাথে যুদ্ধ করে করেই অনেকেই ফিরছেন। আবার অনেককেই আমরা চিরতরে হারিয়ে আজ আমরা শোকাহত। করোনার এই সময়ে শুধু আমি বা আমরা (বাংলা কাগজ পরিবার) শোকাহত নয়; সারা বিশ্বের মানুষ আজ শোকাহত। আমেরিকা, ইটালী কিংবা বৃটেনের কথা নাই বললাম,শুধু যদি আমরা আমাদের সিলেটের কথাই বলি,তাহলে প্রথমেই বলতে হয় আমরা হারিয়েছি সিলেটের নগর পিতা বলে খ্যাত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইকে । “ইন্না লিললাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিঊন “। কামরান ভাই নেই।

বেদনা দায়ক এই সংবাদটি আমি প্রথম দেখি ফেসবুকের একটি পোস্ট থেকে। কিছু নষ্টদের কারণে ফেসবুকের প্রতি আমার বিশ্বাসের কমতি রয়েছে। ভালোভাবে দেখতে গিয়ে পোস্টটি হারিয়ে ফেললাম। তখন রাত দশটা’র উপরে। লক ডাউনের সুবাদে আমার কলেজে জীবনের বন্ধুদের একটি ফেসবুক গ্রুপে আড্ডা দিচ্ছিলাম। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের আড্ডা হয় ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে। আমি তাঁদেরকে সংবাদটি শেয়ার করলে কে একজন বলে উঠলেন, ‘সংবাদটি সঠিক নয়’। তারপর ও আমি ফেসবুক সার্চ সহ টেলিফোন করতে লাগলাম। কোথাও কোন খবর না পেয়ে টেলিফোন করলাম বন্ধুবর মাহবুবুল হাসান ওরফে শরীফ ভাইকে (শরীফ ভাইয়ের দুলাভাই হলেন বদরুদ্দিন কামরান)। শরীফ ভাই ফোন না ধরায় টেলিফোন করলাম আমাদের আরেক বন্ধু রনজু ভাই’র (মোঃ রনজু মিয়া, বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা) কাছে। রনজু ভাইকে অনুরোধ করলাম শরীফ ভাই কাছ থেকে সঠিক খবরটা জানার জন্য। দু’এক মিনিটের মধ্যে রনজু ভাই টেলিফোন করে বললেন শরীফ ভাই বার্মিংহাম থেকে দূরে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে রয়েছেন। তবে কামরান ভাই ভালো আছেন। আমার কেন জানি অস্থিরতা বেড়ে গেলো। মনে মনে ভাবলাম সত্যি হলে খবর আসবেই। এর মধ্যেই সিলেট মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মুশফিক জায়গীরদারের পোস্ট।আমাদের কামরান ভাই আর নেই,এই শিরোনামে। দেখা মাত্রই মনে হয়েছিল আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। মনের অজান্তেই শেয়ার করি। ইতিমধ্যে মনে হলো যে আমার ব্লাডের প্রেসার বাড়ছে। কারণ চুল বিহীন মাথায় একটু একটু ঘাম অনুভূত হলো। তারপর বিশিষ্ট সাংবাদিক, গবেষক আমার অগ্রজ সুজাত মনসুর ভাইকে ফোন দিলাম। সুজাত ভাই বললেন,কোন সংবাদপত্রের নিউজ হলে বুঝে নিও সত্য। ফেসবুকের খবর পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। তবে কামরান ভাইর অবস্থা ভালো নয়। আমি টেলিফোন রাখতে না রাখতেই বার্মিংহাম মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফাহিমা রহিমের টেলিফোন। খবরটা কি সত্যি। আমি বললাম সূত্র ফেসবুক। এরমধ্যে আবার রনজু ভাই ও সুজাত ভাইয়ের পাল্টা ফোন মৃত্যুর নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে। তাঁরপর থেকেই নানান বেদনা ও এলোমেলো নিয়ে আছি। নির্বাহী সম্পাদক রিয়াদ আহাদের বার বার তাগিদের কারণে ভয়ে ভয়ে কয়েকবার লিখতে বসছি কিন্তু স্মৃতি ও আজ এলোমেলো ।
সিলেটের গন মানুষের নেতা,সাবেক নগর পিতা বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইকে নিয়ে যখন কিছু লিখতে বসছি, তখন বার বার কমরেড লেলিনের সেই অমর উক্তির কথা মনে পড়ছে। লেলিন বলেছিলেন বলেছিলেন “কোন কোন মৃত্যু আছে পাখির পালকের চেয়ে ও হালকা আবার কোন কোন মৃত্যু আছে থাই পাহাড়ের চেয়ে ও ভারী”। কামরান ভাইয়ের মৃত্যু যে কতটুকু ভারী তা আজকের সিলেটের দিকে তাকালেই সহজেই প্রতিয়মান। বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। নাহ্ ভুল বললাম একটি জীবন্ত ইতিহাস। ইতিহাসের আলোয় সিলেট বাসীর কাছে জীবন্ত হয়ে থাকবেন বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান । কামরান ভাইয়ের সাথে কবে,কোথায় ,কিভাবে প্রথম পরিচয়,তা নাই বা লিখলাম(লিখার কলোবর বৃদ্ধি হওয়ার আশঙ্কায়); আমার আম্মার মৃত্যুর পর লাশ নিয়ে যখন আমরা তিন ভাই সিলেট ওসমানী বিমান বন্দরে যাই,সেখানে আমাদের নিকট আত্মীয়দের সাথে মেয়র কামরানের পাশে দাঁড়ানোর কথা। তাও বা না লিখলাম, বিভিন্ন সভা সমাবেশ সহ অনেক কিছুর কথা বাদ দিয়ে শুধু মানুষের জন্য তাঁর যে অকৃত্রিম ভালোবাসা তা নিয়ে লিখতে গেলে ফুটে উঠবে, ইতিহাসের আলোকে এক গুনীমানুষের প্রতিচ্ছবি। মেয়র কামরান, আওয়ামী লীগের কামরান, সিলেটের কামরান,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কামরান এগুলো আজ ইতিহাস। আমি ইতিহাসের দিকে যাচ্ছি না। আমি শুধু কামরান ভাইকে দুলাভাই ডাকা’র একটি সুন্দর স্মৃতিময় মুহুর্ত নিয়ে কিছু স্মৃতি চারণ করতে চাই যা ছিলো দুলাভাই’র জীবনের শেষ একটি ‘স্মৃতিময় আড্ডা ‘। স্মৃতিময় আড্ডা এ কারনেই লিখলাম, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা আর শালা-শালী কিংবা শ্বাশুড়-বাড়ীর আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে আড্ডা’র মজাই আলাদা। বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান স্বপরিবারে বৃটেনে এসেছিলেন কিছু দিন আগে ছোট ছেলের বিবাহ উপলক্ষে। আপা আছমা কামরানকে নিয়ে সভা করলো সিলেট উইমেন্স কলেজের এক্স স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক গ্রুপ(ঙঝএডঈ)। সেই অনুষ্ঠানে কামরান সাহেবকেও আনার চেষ্টা চালালে তিনি অসুস্থতার জন্য (বার্মিংহাম) আসতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি বার্মিংহাম আসলে স্বল্প পরিসরে আমরা মিলিত হই আমার সহোদর বাংলা কাগজের অন্যতম ডাইরেক্টর আব্দুল মুয়ীন চৌধূরী সিমনের বাসায়। সেখানে অন্যান্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলা কাগজের সেক্রেটারী আলহাজ্ব খসরু খান, নির্বাহী সম্পাদক রিয়াদ আহাদ,বাংলা কাগজের অন্যতম উপদেষ্টা ফিরোজ রববানী,বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা বন্ধুবর রঞ্জুু মিয়া, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেখ খালিক উদ্দিন,এটিএন বাংলা ইউকের জয়নাল ইসলাম,চ্যানেল আই ইউরোপের লোকমান হোসেন কাজী,বন্ধুবর মাহবুবুল হাসান শরীফ,বাংলা কাগজের ফাইনেন্স উপদেষ্টা আবু এইচ চৌধুরী সুইট,উইমেন্স কলেজ নেটওয়ার্কের মির্জা ফাতেমা খান,আখতারুন চৌধূরী গুলশান,তাহেরা আনোয়ার চৌধূরী নাহিদ,রাশিয়া খাতুন,নূরুন চৌধূরী কলি,পলি সিকদার,মিসেস আছমা কামরান, মিসেস আকলিমা আহাদ, মিসেস ইয়াসমিন হোসেন, মিসেস সুলতানা জয়নাল প্রমুখ। সেদিন স্বল্প সময়ের আডডায় অনেক কিছু নিয়ে কথা হলো। কথা হলো রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে শুরু করে আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে। কথা ছিলো,ছেলের বিবাহের পর টিকেট এক্সটেনশন হলে কবিতা,গান ও আড্ডা হবে। তবে সে আড্ডা আমরা একজন ‘দুলাভাই’কে নিয়ে করবো। এখানে উলেলখ্য যে,বন্ধুবর মাহবুবুল হাসান শরীফের কথা হলো এখন থেকে কামরান ভাইকে ভাই নয়, ‘দুলাভাই’ ডাকতে হবে। কথাটি শোনার পর কামরান ভাইকে বেশ উৎফুল্ল মনে হলো? একসাথে এত শালা-শালী পাওয়া,চাট্টিখানি কথা নয়? আমরাও দুলাভাই ডাকার রিহার্সাল শুরু করছিলাম। কিন্তু বিধি বাম, কই আর তো আমাদের দুলাভাই ডাকা হলো না ? হলো না দুলাভাইকে নিয়ে আড্ডা? দেখা হওয়ার কথা ছিল ছোট ছেলের বিয়েতে। তা ও হলো না। জীবিত বদরুদ্দিন আহমেদ কামরানের চেয়ে মৃত কামরান অনেক শক্তিশালী। আজ তিনি বেঁচে রয়েছেন জনতার কামরান হয়ে সিলেটের ঘরে ঘরে, মানুষ হৃদয়ে হৃদয়ে। পরিশেষে মহান আল্লাহ্’র কাছে একটাই আবেদন তিনি যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আমীন।

লেখক ঃ সহ -সম্পাদক, বাংলা কাগজ। টিভ উপস্থাপক ও কলামিষ্ট।

 

 

সিলেটের গণমানুষের প্রাণ, বদর উদ্দিন আহমদ কামরান

—আব্দুল মালিক

‘‘সিলেটের গণমানুষের প্রাণ, বদর উদ্দিন আহমদ কামরান‘‘। তাঁকে নিয়ে আমি সবসময়ই একথাটি বলতাম। জনসেবা আর রাজনীতি করে জনগনের হ্রদয়ে কিভাবে ঠাঁই করে নেওয়া যায় সিলেটের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সকল মানুষের হ্রদয় গহ্বরে ঠাই করে নেওয়া  কামরান ভাইয়ের সাথে ছাত্রজীবন থেকেই আমার পরিচয়। আমার শিক্ষক ও মামা আ ন ম শফিকুল হক তখন সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সেই সুবাদে বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সাথে নানাভাবে সংস্পর্শ ছিলো। আমি বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সংগ্রামী জীবনের অনেক কিছুই অবলোকন করেছি; তাঁেক নিয়ে অনেক স্মৃতিও আছে আমার। তবে বিলেত প্রবাসী হবার পর নানা ব্যস্ততায় অনেকদিন খুব একটা যোগাযোগ হয়নি। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ওল্ডহ্যাম বাংলাদেশ ইয়ুথ এসোসিয়েশনের ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল শিক্ষা সফরে বাংলাদেশে যাবে;আমিও সে প্রতিনিধি দলের সদস্য। কামরান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ হলো তিনি আমাদের দলকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন।

বাংলাদেশে যাবার পর বিশেষ করে সিলেটে তিনি ওল্ডহ্যাম বাংলাদেশ ইয়ুথ এসোসিয়েশনের ঐ প্রতিনিধি দলকে যে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন, যুক্তরাজ্যে বড় হওয়া সেইসময়ের ঐ তরুণরা এখনো তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করে। একেবারে আপনজনে মতো আমাদের নানা কাজে ভ্রমনে তার ভূমি,কা ছিলো একজন বড় ভাই কিংবা অভিভাবকের মতো। প্রবকাসীদের প্রতি তার ছিলো বিশেষ মমত্ববোধ; আর সেই বোধেই শুধু আমাদের ঐ দলটিকে নয় প্রবাস থেকে কোনো প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে গেছে আর কামরানের ভাইয়ের সহযোগিতা পায়নি তা কেউই বলতে পারবে না।

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য,বাংলাদেশের বাইরে প্রথম শহীদ মিনার স্থাপন। এই শহীদ মিনার স্থাপনের ইতিহাস নিয়ে আমার লিখা বইয়ের ঢাকার পর সিলেটের দ্বিতীয় গ্রন্থালোচনা অনুষ্টানের সভাপতি হবার জন্য ছোট ভাই সাংবাদিক মনোয়ার জাহান চৌধুরীর মাধ্যমে বদর উদ্দিন কামরানকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। সেদিন ঐ অনুষ্টানের সম্মানিত সভাপতি হয়ে তিনি আমাকে কৃতজ্ঞতার দ্বারে আবদ্ধ করে রেখে গেছেন। মঞ্চে বসেই এক পলকে বইটির অধিকাংশই পাঠ করে তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন নিঃসন্দেহে বলতে পারি তুমার এবং ওল্ডহ্যাম বাংলাদেশ ইয়ুথ এসোসিয়েশনের এই কর্মযজ্ঞ ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। সেদিনের সেই অনুষ্টানেই তাঁর সাথে আমার জীবনের শেষ সভা। যদিও তিনি কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবসতঃ ওল্ডহ্যাম আসার কথা থাকলেও আসা হয়নি ; বিধায় আর দেখাও হয়নি। আর দেখা হবেও না কোনো দিন। কামরান ভাই আমাদের সবাইকে ছেড়ে না ফেরার রাজ্যে চলে গেছেন। কামরান ভাই আপনি না ফেরার রাজ্যে চলে গেলেও সকল প্রবাসীর হ্রদয়ের যেখানে আপনার স্থান হয়েছে সেখান থেকে কখনো কোথাও যেতে পারবেন না। আপনার কর্মগুনেই আপনি থেকে যাবেন সর্বদাই।

লেখক ঃ ওল্ডহাম প্রতিনিধি বাংলা কাগজ এবং সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

 

 

চলে গেলেন জনতার কামরান

–আমিরুল ইসলাম বেলাল

মাস চারেক আগের কথা। কোনো একদিন বিকেলে বার্মিংহাম মিঠাই ঘরে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম,হঠাৎ বদরুদ্দীন আহমেদ কামরান ভাই স্ব-শরীরে উপস্থিত। সাথে ছিলেন মুহিবুল হাসান শরীফ ভাই(কামরান ভাইয়ের শ্যালক)যিনি বার্মিংহামেই স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন। হঠাৎ করে জনতার নেতা কামরান ভাইকে কাছে পেয়ে ইতস্তত বোধ করলেও তিনি নিজেই বললেন সংক্ষিপ্ত সফরে এসেছি,সময় খুবই কম,পাশ দিয়েই যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম আপনাদের সাথে দেখাটা করেই যাই,অনেক পীড়া-পীড়ি করলেও কোন আপ্যায়ণ করাতে পারিনি। শুধু বললেন আরেরকবার আসলে অবশ্যই কিছু খেয়ে যাবো। কাঁধে হাত রেখে পরম মমতায় বললেন, চলো একটা ছবি উঠাই,হলো ও তাই। কিন্তু এটাই যে তাঁর সাথে শেষ ছবি হবে সেটা কল্পনায় ও ভাবিনি। বলছিলাম জনতার নেতা সদ্য প্রয়াতঃ বদরুদ্দীন আহমেদ কামরান ভাইয়ের কথা।


প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে প্রাচীনতম জেলা শহর সিলেটে বার বার পৌর কমিশনারই শুধু নির্বাচিত নয় তৎকালীন দাপুটে নেতা সৈয়দ বাবরুল হোসেন বাবলুকে পরাজিত করে বাজিমাত করে পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এর পর আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি। জনপ্রতিনিধিত্বের সাথে সাথে স্থান করে নিয়েছিলেন সাধারণ জনমানুষের মনি কোঠায়ও। আর সেটাই ছিল তাঁর জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসার মূল মন্ত্র। ১ জানুয়ারি ১৯৫১ সনে প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নিয়েও কারো দয়া কিংবা অনুকম্পায় নয়,জনতার বদরুদ্দীন আহমেদ কামরান জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার জন্য তাঁর নিজ দক্ষতা এবং যোগ্যতাই ছিলো চাবি কাঠি বলে আমার কাছে মনে হয়। ,নিজ যোগ্যতা দিয়েই হয়ে উঠেছিলেন জনতার কামরান,দলীয় অবমূল্যায়নের মনোকষ্ট নিয়ে প্রিয় কামরান ভাই ১৫ জুন ২০২০ ইহজগত থেকে বিদায় নিয়েছেন। প্রতিপক্ষের রোষাণলে পড়ে চৌদ্দ শিকের ভেতরের কামরানকে জনতার অফূরন্ত ভালো ভাষায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত করে বীরের মর্যাদা দিলেও নির্দ্বিধায় বলতে পারি তাঁর নিজ দলীয় সরকারের ঢাউস মন্ত্রী সভায় অনেক অযোগ্য অপরিচিত এবং জনবান্ধবহীন ব্যক্তির জায়গা হলেও জায়গা হয়নি জনতার কামরানের। মনোকষ্ট নিয়ে কামরান ভাই চলে গেলেও তাকে আমরাও সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি তা আজীবন বুকেই থাকবে। কামরান ভাই পরপারেও আছেন ভালো থাকবেন এই কামনাই করছি।

লেখক ঃ টিভি ওয়ান প্রতিনিধি বার্মিংহাম ও বিশেষ প্রতিনিধি বাংলা কাগজ।

 

 

Words can’t express

——Nurun Choudhury Colly

Words can’t express the shock and sadness I felt when I heard about the passing of Mr. Badar Uddin Ahmed Kamran (Vai), the former Mayor of Sylhet. The upsetting news, of this wonderful high-profile figure from Bangladesh, whom I had the privilege of meeting only months before, in the UK, along with his wife,our sister, Mrs. Asma Kamran (Apa), made so many of us emotional across the world. I had been kept updated by sister, Shajna Begum who was in touch with the family, from when both Asma Apa and Kamran Vai fell ill, to the sad news of him leaving this world. All the memories came flooding back, still fresh, as if it were just yesterday I had seen him.

Where do I begin with all the sweet memories that they both left behind, with our family and friends in the UK? The unforgettable memory I have, is their visit to our house. This was the final gathering with them both and attended also by our family members and close community and media friends, before they both had to leave Birmingham. How lucky we were to be able to have their presence after hearing that so many had invited them, but they had to refuse due to lack of time, and also finding that Kamran Vai had extended the stay in Birmingham, to accept our invitation. Once they’d accepted, I felt the nerves kick in, although I had previously met Asma Apa, as she is the sister of our close family friend, Mr. Mahbubul Hassan Shorif Vai. I also had the opportunity of spending time with Asma Apa, having been involved with the event that was held specially for her, by the Organisation of Sylhet Government Women’s College (B’ham).

However, this would be the first time, that I’d be meeting our famous Kamran Vai from Sylhet. I’d heard so many good things about him before from my brother-in-law and husband, as he had attended both my mother-in-law and father-in-law’s funerals in Bangladesh and visited my father-in-law in our village prior to that. It left me wondering if I’d be able to live up to their expectations here, in the UK.

From the minute our respectable guests walked through the door, there was a genuine warm atmosphere in the house, with Kamran Vai talking to, and taking an interest in, everyone that attended the gathering. He never once objected to any pictures, talked and laughed for hours, complimented the food, the surroundings, the people and all-in-all, both him and Asma Apa gave off positive vibes. I had been nervous for nothing. Kamran Vai even insisted we call him Dhulavai, so he could joke with us. After our main meal, as I was bringing out the tea and desserts to the table, he asked, “Is there anything else possibly left to feed me?” to which I instantly replied, “Let me just go and check,I may find something.” I still remember his cheerful laughter on hearing my reply, echoing around the house. Soon after this, they left for London. Within a week, we received an invitation to attend his son’s lovely wedding, in London, for which we felt greatly honoured. This would be the last time sadly we ever saw Kamran Vai. Even though they were very busy, with many VIPs also attending, both him and Asma Apa came off the stage several times to speak to all of us guests personally.

On this note and lovely memory of the wedding, I’m ending with our most distinguished Kamran Vai’s last words to me, “Next time you come to Bangladesh, you must visit our house.” The sad fact is, In sha Allah, if I ever get to visit Bangladesh again, Kamran Vai will not be there and he will be forever missed by us all. May Allah (SWT) grant him the highest rank in Jannatul Ferdous.

 

প্রয়াতঃ বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানকে নিয়ে রিয়াদ আহাদের লিখা

‘‘বাঁচলে ইতা বউত অইবো‘‘

বাংলা কাগজ আর বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান। এ দুটি নাম একেবারে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। অনেক প্রতিকূলতা মাড়িয়ে ষোল বছর পুর্বে বাংলা কাগজের পথচলাই শুরু হয়েছিলো বদর উদ্দিন আহমেদের হাত ধরেই। আমার সহোদর বাংলা কাগজের প্রধান সমন্বয়কারী (বর্তমান স্পেন প্রবাসী) সাহাদুল সুহেদকে তখন বাংলাদেশে বাংলা কাগজের সকল দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তৎকালীন সময়ে সিলেট এমসি কলেজের ইংরেজী বিভাগের মেধাবী ছাত্র হিসেবে তার সঙ্গে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের খুব ভালো সর্ম্পক ছিলো। সাহিত্য সংস্কৃতি কৃষ্টির বিষয়ে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের খুবই আগ্রহ থাকায় তখন সাহাদুল সুহেদকে নানা সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশনায় নানাভাবে তিনি সাহায্যও করেছিলেন। সাহাদুল সুহেদ যখন তার কয়েকজন মেধাবী সহপাঠিসহ বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মেধাবী ছাত্রদের সমন্বয়ে বাংলা কাগজের প্রকাশনার বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করে তখন প্রায় নিয়মিতই বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান খোঁজ খবর রাখতেন। ২০০৪ সালের ৪ মার্চে শত ব্যস্ততার মাঝেও বাংলা কাগজের প্রকাশনা উৎসবে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সিলেটে বাংলা কাগজের আনুষ্টানিকভাবে মোড়ক উন্মোচন করেন।

বাংলা কাগজ তখন ইংল্যান্ড ছাড়াও সিলেট থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হতো। বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় থেকে একটি সংবাদপত্র হিসেবে বাংলা কাগজের রেজিষ্ট্রেশনের বিষয়েও বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান সাহায্য করেন। তৎকালীন সরকার থেকে সংবাদপত্র হিসেবে বাংলা কাগজের অনুমোদনে তিনি ছিলেন প্রধান সুপারিশকারীও। সরাসরি কোনো রাজনীতিক মতাদর্শ বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী ছাড়া বাংলাদেশ থেকে একটি সংবাদপত্র হিসেবে রেজিষ্ট্রেশন ও অনুমোদন পাওয়ার বিষয়ে নানা প্রতিকূলতা থাকে এটা সকলেই জানেন। বাংলা কাগজ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোনো রাজনীতিক মতাদর্শকে ধারণ করেনি বিধায় তখন সরকারী অনুমোদন পাওয়া সহজ ছিলো না। বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান বাংলা কাগজের রেজিষ্ট্রেশনের বিষয়ে নেপথ্যে নানা কাজ করেছেন ; তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানেরও এবিষয়ে বিরাট ভূমিকা ছিলো। বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানই অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে বাংলা কাগজের বিষয়টি অবিহত করেন। পরবর্তীতে সাহাদুল সুহেদ স্পেন প্রবাসী হলে সাংবাদিক সজল ছত্রী বাংলা কাগজের বাংলাদেশ অফিসের দায়ত্বি পান। হলুদ সাংবাদিকদের ভিড়ে সিলেটের ক্লিন ইমেজের গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে সজল ছত্রী ছিলেন বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের অতি পছন্দের একজন। সুযোগ পেলেই তিনি সিলেটের রাজা ম্যানশনে থাকা বাংলা কাগজের অফিসে যেতেন,সজল ছত্রীর কাছ থেকে খোঁজ খবর রাখতেন। সজল ছত্রীও প্রায় নিয়মিতভাবে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের কাছে বাংলা কাগজ পৌছাতেন।

বাংলা কাগজ বাংলাদেশ অফিসের তত্বাবধানে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেটের রোজ ভিউ হোটেলের কনফারেন্স হলে বাংলা কাগজের সেক্রেটারী খসরু খানের সংবর্ধনা ও ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়। বৃহত্তর সিলেটের বেশ ক‘জন এমপি,সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার,জেলা প্রশাসক,বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকতা,পুলিশ সুপারসহ কবি,সাহিত্যিক,সাংবাদিক,বুদ্ধিজীবি এবং বাংলা কাগজের বিভিন্ন উপজেলার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ঐ অনুষ্টানের প্রধান অতিথিও ছিলেন বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান। নানা কারণে ঐ অনুষ্টান নিয়ে কিছুটা ভিন্নরকম চাপও ছিলো। যেহেতু খসরু খানের সংর্বধনার পাশাপাশি ইফতার পার্টিও। বিধায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সকল অতিথিরা চলে আসলেও বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান আসছিলেন না। অতিথিদের বক্তব্য পর্ব অনেকটা শেষের দিকে ; ইফতারের সময় একেবারে কাছাকাছি। অনুষ্টানের সঞ্চালক হিসেবে আমি শুধু ঘোষনা দিচ্ছিলাম অল্পক্ষনের মধ্যে প্রধান অতিথি চলে আসছেন। প্রচন্ড ব্যস্ত থাকলেও সজল ছত্রীকে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি আসবেন। আমি সজল ছত্রীকে বলছিলাম সজল মেয়র কোথায়। সজল বললো, ভাই কোনো টেনশন নিয়েন না ; কামরান ভাই যেহেতু বলেছেন তিনি আসেবন ই। হ্যা, একেবারে ইফতারের শুরুর মুহুর্তেই তিনি আসলেন। কোনো বিশেষনে ধার না ধেরে সরাসরি মঞ্চে গিয়ে মাইক হাতে প্রথমেই সকলের কাছে ক্ষমা চাইলেন তার বিলম্বের কারনে। জানালেন অন্য আরো কয়েকটি অনুষ্টানে যোগ দিয়ে আসাই এই বিলম্বের কারন।

সেদিন বাংলা কাগজ নিয়ে তার খুবই অল্প,কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ ছিলো। ব্যনারে ইফতার পার্টি লিখা দেখে বললেন,ইফতার পার্টি নয়,মুসলমানদের লিখতে হবে ইফতার মাহফিল (এরপর থেকে বাংলা কাগজের সকল ইফতারীতেই ব্যনারে আমরা কখনো ইফতার পার্টি নয় লিখি এবং বলি ইফতার মাহফিল)। ইফতার শেষে বাংলা কাগজের সকল প্রতিনিধিসহ আমাদের সাথে বেশ কিছুক্ষন আড্ডা দিলেন। সরস সেই আড্ডায় তার মধ্যে কোনো ধরনের কোনো আমিত্বের বহিঃপ্রকাশ ছিলো না ; ছিলো একজন সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবিই। আমরা বাংলাদেশ থেকে বড় হয়ে হয়ে আসলেও বাংলা কাগজের সেক্রেটারী খসরু খানের বেড়ে উঠা ব্রিটেনেই। বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ বড় এই কর্মকর্তার সেদিন বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের সাথে মিলিত হবার পর আমাকে বললেন রিয়াদ ভাই,উনার সাথে মিলিত না হলে তো দেশের নেতা-নেত্রীদের সম্পর্কে আমার বিরুপ ধারনাগুলো থেকেই যেতো। এখনো সত্যিকার অর্থে ভালো মানুষরা আছে বলেই বাংলাদেশ পথ হারাচ্ছে না। তখন বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান সিলেটের মেয়র। আর মেয়র হয়েও সাধারন মানুষের মতো চলাফেরা,অহংকারহীন আর সরল আচরণ খসরু খানকে বেশ বিমোহিতই করেছিলো।

বাংলা কাগজের সাথে নিবিড় সংশ্লিষ্টতা থাকলে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের সাথে আমার খুব একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো সেটা বলতে পারবো না। বাংলা কাগজ নিয়ে মূলতঃ সাহাদুল সুহেদ আর সজল ছত্রীর সঙ্গেই ছিলো তাঁর সকল যোগাযোগ। যুক্তরাজ্যে মাঝে মধ্যে আসলেও তাঁর সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ হতো না। আামার স্পেন থেকে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমানোরও অনেক দিন হয়ে গেছে। আমার মতোই ইটালী থেকে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের শ্যালক মাহবুবুল হাসান শরীফ। এক সময়কার সিলেট বেতারের তালিকাভূক্ত শিল্পি মাহবুবুল হাসান শরীফ প্রায় বছর চারেক ধরে বার্মিংহামেই স্বস্ত্রীক বসবাস করছেন। সৃজনশীল এই মানুষটির সঙ্গে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক। অন্যদের কাছ থেকে জানলেও তিনি যে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের শ্যালক তা কখনো কোথাও প্রকাশ করতেন না। চলতি বছর ফেব্রুয়ারীতে বদর উদ্দিন কামরান স্ত্রী আসমা কামরানসহ ইংল্যান্ডে আসেন। ইংল্যান্ডে এসে শ্যালক মাহবুবুল হাসান শরীফের বাসায় যে কদিন ছিলেন,সে কদিনের প্রায় প্রতিদিনই সকালে তাঁর সাথে লম্বা আড্ডা হতো। শ্যালক মাহবুবুল হাসান শরীফ তাঁর খুব প্রিয় ছিলেন। শালার বউয়ের হাতের সুস্বাদু খাবার আর শালার বন্ধুদের সাথে প্রানবন্ত কথা-বার্তায় সবসময় তাঁকে মনে হয়েছে তিনি খুবই একজন সাধারণ মানুষ। অনেক খোলামেলা কথাই হয়েছে তার সঙ্গে,প্রবাসীদের নিয়ে,রাজনীতি-সমাজনীতি এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত অনেক বিষয়ও। কথাবার্তায় তারমধ্যে কখনো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ছোঁয়া পাইনি বরং ভালো মানুষদের মুল্যায়নের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছি। দলীয় রাজনিীতি করে খারাপকে খারাপ আর ভালোকে ভালো বলার মতো ক্ষমতা আজকাল অনেকেরই নেই ; যা তার মধ্যে ছিলো। আড্ডার মধ্যেই তাঁর নেতা-কর্মীদের অনেক ফোন আসে। বিভিন্ন শহরে তাঁেক সংবর্ধনার আমন্ত্রণ ছাড়াও বার্মিংহামেও অনেকে বাসায় গিয়ে দাওয়াত খাবারও আমন্ত্রণ দেন। তিনি কোথাও যেতে চাইলেন না। একপর্যায়ে আমি যখন বললাম আপাসহ আমার বাড়ী দেখে যেতে হবে। তখন রাজী হয়ে বললেন, শুধু চা খেতে যাবো।

বার্মিংহাম থেকে চলে যাওয়ার দিন ২৯ ফেব্রƒয়ারীর বিকেলে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান আপা আসমা কামরানসহ আমার বাসায় আসলেন। চা নাস্তার ফাঁকে আমার ছেলে নিহাদের সাথে বেশ জমিয়ে কথা বললেন। আমি নিহাদকে বলেছিলাম বাংলাদেশের বড় একজন মানুষ আমাদের বাসায় আসবেন ; নিহাদ বেশ আগ্রহ ভরেও তার সাথে কথা বলে। এই আগমনে জোর করেও কামরান ভাইকে চা নাস্তার বাইরে অন্য কিছু খাওয়াতে পারিনি। বললেন ‘‘ভাই পরেরবার আইলেউ তুমার অনো খাইমু‘‘। আমরা চাইলাম তাঁেক বড় করে সার্বজনিন একটা সংবর্ধনা দেবো। কিন্তুু তিনি রাজী হলেন না। বললেন রিয়াদ, ‘‘এবার না রে ভাই,বাঁচলে ইতা বউত অইবো – আর আমি ইতার ইন্টারেষ্টও নায়; তোমরার লগে দেখা অইলো মাত অইলো অটাই ভালা‘‘। বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের মৃত্যু সংবাদটি যখন আমার কাছে পৌছুলো তখন আমার কানে শুধু ‘‘ভাই পরেরবার আইলেউ তুমার অনো খাইমু‘‘ আর ‘‘বাঁচলে ইতা বউত অইবো‘‘ শব্দটা খুব বাজছিলো। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে অনেক দুরে নিয়ে গেলো। পরেরবার নয় আর কোনোবারই তার আসার কোনো সুযোগ থাকলো না। আমার বাসা থেকে বেরুবার সময় হটাৎ বলে উঠলেন,এসো তুমার পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটি ছবি উঠি। ছবি উঠা হলে আপা আসমা কামরানকে বললেন ছবিটা তাঁর কাছে রাখার জন্য। লন্ডনে গিয়েই দুদিন পর তাঁর ফোন। ‘‘রিয়াদ আমার ছেলের বিয়ে ঠিক করেছি – তোমাকে তোমার বউ-বাচ্চাসহ আসতে হবে।‘‘ আকস্মিকভাবে বিয়ে ঠিক হওয়ায় তার অতি প্রিয়জন ছাড়া অধিকাংশদেরই আমন্ত্রন দিতে পারেননি। লন্ডনে বিয়েতে গিয়ে দেখি তবুও ইংল্যান্ডের বাঙালী কমিউনিটির শীর্ষদের অধিকংাশই সেখানে উপস্থিত। আমি ভেবেছিলাম এতো শীর্ষজনদের ভীড়ে আমাদেরকে হয়তো হ্যালো বলার সুযোগই তিনি পাবেন না। কিন্তু ঠিকই তিনি টেবিলে এসে জিজ্ঞাসা করলেন,বউ বাচ্চাদের নেইনি কেনো জানতে চাইলেন। ফিরে আসার সময় ধন্যবাদ দিলেন বার্মিংহাম থেকে গিয়েও তার আমন্ত্রণ রক্ষা করায়।

বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানের এবারে ইংল্যান্ড সফরে তার সাথে বেশ আন্তরিকভাবে মিশে যাওয়ায় তার প্রতি অলাদা একটা শ্রদ্ধাবোধও জাগ্রত হয়েছিলো। তিনি একজন জনবান্ধব নেতা,একজন আদর্শবান মেয়র,একজন সৎ রাজনীতিবিদ,একজন খুব ভালো মানুষ এবং সর্বোপরি নিরহংকারী ছিলেন তা বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তুু তিনি যে দল মত আদর্শের উর্ধ্বে সত্যিকার অর্থে জনতার কামরান ছিলেন ; তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সিলেটের মানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে তা অনুধাবন করলাম। বাংলা কাগজ এবং আমার সাথে তাঁর ঐ সম্পর্কের দায়বদ্ধতায়ই এ সংখ্যা বাংলা কাগজে তাঁকে নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করার পরিকল্পনা নেই। কামরান ভাই এখন নেই, তিনি আর মেয়র হবে না; হবেন না কোনো বড় পদে আসীনও। সবকিছুর উর্ধ্বে চলে গেছেন তিনি। তাঁকে মনে রাখার প্রয়োজন হয়তো অনেকেই মনে করবেন না। কিন্তু বাংলা কাগজ এবং এই আমরা কখনো প্রিয় এই মানুষটিকে ভূলবো না। কামরান ভাই আপনি আজীবন আমাদের হ্রদয়ে থাকবেন একজন বড় মাপের ভালো মানুষ হিসেবে।

লেখক ঃ নির্বাহী সম্পাদক, বাংলা কাগজ। বার্মিংহাম প্রতিনিধি চ্যানেল এস ও যমুনা টিভি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *