নিউজ ডেস্কঃ  বোরোর ভরা মৌসুমে ব্যবসায়ীরা কম দামে বেশি পরিমাণে ধান ও চাল কিনে মজুদ করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এ আশঙ্কা থেকে নিয়মের বাইরে মজুদ ঠেকাতে খাদ্য অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনকে তদারকি বাড়ানোর অনুরোধ করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

গতকাল্মব ঙ্গলবার খাদ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে খাদ্যশস্যের অবৈধ মজুদ নিয়ন্ত্রণ ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মনিটরিং জোরদার করতে হবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সব জেলায় নিয়মিত অভিযান ও সংশ্নিষ্ট আইনের আওতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অব্যাহত রাখতে হবে। আর ঢাকা মহানগরে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে তদারকি করবে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আওতায় গঠিত মনিটরিং টিম। কেউ যাতে লাইসেন্স ছাড়া ধান-চালের ব্যবসা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে চিঠিতে। পাশাপাশি আমদানিকারক, আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা কী পরিমাণ ধান ও চাল বিক্রি করছেন, তা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়কে ব্যবসায়ীদের জানাতে হবে।

খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম সমকালকে বলেন, এ মনিটরিং নিয়মিত করা হয়ে থাকে। মাঠ পর্যায়ে যাতে মনিটরিং জোরদার থাকে সেজন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর এ ধরনের অনুরোধ সংশ্নিষ্ট পক্ষগুলোকে করা হয়ে থাকে। মন্ত্রণালয় চায়, যারা খাদ্যশস্যের ব্যবসা করবেন, তারা সবাই ফুডগ্রেইন লাইসেন্স নেবেন। লাইসেন্স ছাড়া কেউ ব্যবসা করবে না।
খাদ্য অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মৌসুমের সময় ধান ও চালের দাম কম থাকে। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এ সময়ে প্রচুর পরিমাণে ধান, চাল কিনে মজুদ করে রাখেন। এতে বাজারে সরবরাহ কমে বা বাজার কিছু ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সরকারও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ঠিকমতো করতে পারে না। এ অবস্থা যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য মনিটরিং ও অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।
কোনো মিলার যাতে অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ করতে না পারেন সেজন্য গত বছরের ২১ ডিসেম্বর খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, কোনো চালকল মালিক দৈনিক আট ঘণ্টার ছাঁটাই ক্ষমতা ধরে পাক্ষিক ছাঁটাই ক্ষমতার তিনগুণ চাল সর্বোচ্চ ৩০ দিন মজুদ রাখতে পারবেন। এ ছাড়া ২০১১ সালের আরেক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আমদানিকারক তার আমদানি করা শতভাগ পণ্য সর্বোচ্চ ৩০ দিন মজুদ রাখতে পারবেন। পাইকারি ব্যবসায়ী সর্বোচ্চ ৩০০ টন ধান অথবা চাল এবং ২০০ টন গম সর্বোচ্চ ৩০ দিন মজুদ রাখতে পারবেন। খুচরা ব্যবসায়ী সর্বোচ্চ ১৫ টন চাল অথবা ধান এবং ১০ টন গম সর্বোচ্চ ১৫ দিন সংরক্ষণ করতে পারবেন।
গত বছরের বন্যার কারণে উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে চালের সরবরাহ কমে আসে। এতে দফায় দফায় প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার নিজে এবং বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি শুরু করে। যদিও বোরো ধান ওঠা শুরুর পরে দাম সম্প্রতি কিছুটা কমেছে। তার পরও গত বছরের তুলনায় বেশি। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবারও রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৪৩ থেকে ৪৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। আর মাঝারি মানের প্রতি কেজি চাল বিক্রি হয়েছে ৪৬ থেকে ৫২ টাকা এবং সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৫৫ থেকে ৬২ টাকা কেজি দরে।
বর্তমানে সরকারের হাতেও মজুদ কম। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মে সরকারের হাতে সাত লাখ ৯২ হাজার টন খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে চাল পাঁচ লাখ টন এবং দুই লাখ ৯২ হাজার টন গম। কিছুদিন আগে সরকারের মজুদ আরও কম ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জনসংখ্যা এবং চাল ও গমের ভোগ অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য পরিস্থিতির জন্য সরকারের হাতে কমপক্ষে ১০ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ থাকা উচিত। সরকার ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার থেকে সেদ্ধ ও আতপ চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কিছু চাল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
অন্যদিকে কয়েকশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৪ মে পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে ৪১০ টন চাল ও ৪৭৮ টন গম আমদানি হয়েছে। আর বেসরকারি পর্যায়ে ৭৬৯ টন চাল ও চার হাজার ২৯০ টন গম আমদানি হয়েছে।