৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৯শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

জাগ্রত নজরুল, বিদ্রোহী নজরুল

newsup
প্রকাশিত অক্টোবর ২৯, ২০২১
জাগ্রত নজরুল, বিদ্রোহী নজরুল

সাহিত্য ডেস্কঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস হাজার বছরের। ধীরে চলা বাংলা সাহিত্যে এক প্রচন্ড গতি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন আজীবন বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যে অতি উচ্চ আসন পেয়েছেন প্রেমের কবি, মানবিক কবি, সংগ্রামের কবি, সামাজিক কবি এবং ধার্মিক কবি সুসাম্প্রদায়িক কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর মাঝে প্রেম ছিলো তাই তিনি প্রেমিক, তাঁর মাঝে মানুষের জন্যে ত্যাগী মানুষ ছিলো তাই তিনি মানবিক তিনি যতোদিন সচেতন ছিলেন দেখা যায় তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন তাই তিনি সংগ্রামী কবি বিদ্রোহী কবি, তিনি সমাজ ধর্ম পালন করতেন এবং অসামাজিক কাজে প্রতিবাদ করতেন তাই তিনি সামাজিক, তিনি ধর্মের পথেই চলতেন তাই তিনি ধার্মিক। তিনি ধার্মিক ছিলেন বলেই তাঁর চেতনায় আল্লাহ ও রাসূলের প্রেম ছিলো এবং আযান, নামাজ, মসজিদ, কবর, রমজান, ঈদ ইত্যাদি ইসলামি বিষয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ তাঁর ছিলো। কাজী নজরুল ইসলাম সমাজে থেকে যেমন অপরাপর মানুষের সমাজের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাতেন না তেমনি নিজে মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত হয়েও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি তাঁর ছিলো ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। তিনি কখনো অন্য ধর্মের প্রতি কটাক্ষ করে অশ্লীল কথা বলেননি, তাই তিনি সুসাম্প্রদায়িক কবি। কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের সমাজভুক্ত হয়ে অসামাজিক মানুষ নয়, বরং, তিনি সামাজিক মানুষ ছিলেন, তেমনি তিনি ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত একজন উচু মাপের সাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি ইসলামি আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অন্য ধর্মের বা সম্প্রদায়ের প্রতি এতোটুকু বিদ্বেষ দেখাননি। কাজী নজরুল ইসলাম নিজে মুসলিম হয়েও জাতিতে জাতিতে ভেদাভেদ আর হিন্দু মুসলমানের সম্প্রদায়গত বিভেদকে তিনি ঠেলে রেখেছেন দূরে। তাই তাঁকে সুসাম্প্রদায়িক মানুষ বলতে কারো মনে এতোটুকুও দ্বিধা থাকতে পারে না। তিনি বলেন-
‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু মুসলমান/মুসলিম তার নয়ন-মণি হিন্দু তাহার প্রাণ।’
কাজী নজরুল ইসলাম সবখানেই আছেন। তবে এখানে নজরুলের সৃষ্টির দিকে মনোযোগ রেখে তাঁর বিদ্রোহী চেতনার কথা বলা হবে। নজরুল কবিতা লিখেছেন, গান, গল্প, প্রবন্ধ, গজল লিখেছেন। তিনি তাঁর রচিত গানে প্রেমের সুর তুলেছেন আবার গান ও কবিতায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন। নজরুল গল্প লিখেছেন, নাটক, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ সাহিত্যে তিনি তাঁর সময়ে থেকে-ই মহাকালে ছুটে চলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম সাজানো ড্রইং রুমে বসে বিলাসী জীবন কাটিয়ে মানুষকে জাগো জাগো বলে ডাকেননি; বরং, তিনি সশরীরে সচেতনভাবে জেগে থেকে সংগ্রাম করতে করতেই জাগরণী কবিতা ও গান রচনা করেছেন। কাজী নজরুর ইসলামের সকল পরিচয় ছাপিয়ে তাই বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছেও বিশ্বের অন্যান্য জাতির কাছে বিদ্রোহী নামে-ই নজরুল সমধিক পরিচিত। কে না-জানে তাঁর বিদ্রোহী পরিচয় ফুটে উঠার পিছনে নিঃসন্দেহে তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রভাব ফেলেছে। এছাড়াও তাঁর বহু কবিতা ও গানে বিদ্রোহের ডাক পাওয়া যায়। কবির রচিত ঊনিশটি গল্প ও বহু প্রবন্ধ পড়লেও বুঝা যায় তিনি মানুষের সমাজে অমানুষি দানব শক্তির অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশ করেছেন

কাজী নজরুল ইসলামের মতো সাহিত্যে নির্যাতিত মানুষকে অন্যায়ের শিকলবন্দী জীবন থেকে বের হয়ে আসার জন্যে এভাবে কেউ বলতে পারেননি- ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট/ভেঙ্গে ফেল, কররে লোপাট,/রক্ত-জমাট/শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।/ওরে ও তরুণ ঈশান!/বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!/ধ্বংস নিশাল/উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।’

কাজী নজরুল ইসলামকে সাম্যের কবিও বলা হয়। তিনি বলেন-
‘গাহি সাম্যের গান-/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান!’
বহু পরিচয়ে বিকশিত কবিকে নিয়ে কিছু কথা বললেও তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে কিছু বলতে হয় এবং জানতে হয়। কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৯ খ্রিস্টীয় সালের ২৪মে যা বাংলা বর্ষের ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ এবং বাঙালিরা ১১ জ্যৈষ্ঠ তারিখটি কবি নজরুলের জন্মদিন হিসেবে মনে গেঁথে নিয়েছেন। আমরা প্রতি বছর কবি নজরুলের জন্মদিন পালন করে থাকি এবং আমরা অনেক বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকের জন্মশত বর্ষও পালন করেছি। কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট কবিতার জন্মশতবর্ষ পালন করার ব্যাপারটি খুবই বিস্ময়কর নিশ্চয়। যে কবিতা বারবার দুঃসময়ে সমাজের মানুষকে জাগায় সেই কবিতা শতবর্ষ পরেও উদ্ভাসিত হয় নতুন তেজে।

একটি কবিতা সমাজকে নাড়িয়ে দিতে পারে বারেবারে তেমন কবিতা-তো সকল সময় রচিত হয় না। হ্যাঁ, চির বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এমন কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর ভারত উপমহাদেশ কাঁপানো সেই কবিতা ‘বিদ্রোহী’ তিনি রচনা করেছেন ১৯২১ খ্রীষ্টিয় সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সময়ে। তাই এখন ২০২১ খ্রীষ্টিয় সালের শেষ প্রান্তে আমরা নজরুল রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ উদযাপন করছি মনে মনে প্রাণে প্রাণে উৎসবের আমেজে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি শতাব্দী জয়ী কবি কাজী নজরুল ইসলামের শতাব্দী জয়ী শ্রেষ্ঠ কবিতা।

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য প্রতিভা অতুলনীয়। সে জন্যেই ১৮৯৯ খ্রীষ্টিয় সালে জন্ম নেয়া নজরুল ১৯২১ সালে মাত্র ২২ বছর ৮ মাস বয়সে বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘বিদ্রোহী’ রচনা করে ঝড় তুলেছেন। আসুন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কিছুটা পড়ি-
‘বল বীর/চির উন্নত মমশির।/শির নেহারি আমারি, নতশির/ওই শিখর হিমাদ্রির।’

কবি এখানে মানুষকে সাহসে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এখানে কবি বাঙালি তথা সারা বিশ্বের মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে রাখতে আহ্বান জানালেন। নজরুলের বিদ্রোহী রূপ ও প্রেমের নজরুলকে পাশাপাশি দেখতে পাই। কবি প্রেমিক ও যোদ্ধা। তিনি ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় উচ্চারণ করেছেন- ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী/আর হাতে রণ তুর্য!’
এখানে পাই কবির সুন্দরের পথে চলার আহ্বান এবং অসুন্দর ধ্বংসের প্রতিজ্ঞাবাক্য।

আমরা জেনেছি কবি কাজী নজরুল ইসলাম সৈনিক ছিলেন। তিনি প্রথম মহাযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাঁর মন ও মননকে প্রভাবিত করেছে। সেনাবাহিনীর কর্ম শেষ করে তিনি ১৯২০ খ্রীষ্টিয় সালের মার্চে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং সাহিত্যে মগ্ন হন। যখন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচনা করেন তখন নজরুল থাকতেন কলকাতায়। কবি তখন সমাজতন্ত্রী নেতা কমরেড মুজাফফর আহমদ এর সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন এবং একসাথে থাকতেন। সারারাত জেগে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার পরে সকাল বেলা কবি প্রথমে কবিতাটি কমরেড মুজাফফর আহমদকে পড়ে শুনান। সেদিক থেকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা ও পাঠক কমরেড মুজাফফর আহমদ। আমরা পাই ১৯২১ সনের কার্তিক সংখ্যা ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ ও ‘কামাল পাশা’ প্রকাশিত হয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশ হয় ১৯২২ খ্রীষ্টিয় সালের ৬ জানুয়ারি তৎকালীন বিজলী পত্রিকায়।

কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পরে-ই সেকালের বাংলার তরুণ সমাজের কাছে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি/ খ্যাতি লাভ করেন এবং এভাবেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্যকে নিপীড়িত জনগণের আন্দোলনের সাথে মিলিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শীর্ষে ঠিক তখন কাজী নজরুল ইসলাম যেভাবে মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রাম অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন আর হিন্দু সম্প্রদায়ের ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে মিল ঘটানোর যে আহ্বান সাহিত্যে নিয়ে এসেছেন, তেমনটি আর কেউ পারেননি।

কাজী নজরুল ইসলাম এবং তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। অনেকে অনেকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। নজরুল ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বিষয়ে আলোচনায় বলা যায়, তাঁর জীবদ্দশায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘটনা এবং রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব, ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের মাঠের চিত্র তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও অন্যান্য তেজোদীপ্ত কবিতা ও গান লেখায় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ খ্রীষ্টিয় সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন যা ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে কবর দেয়া হয়েছে। একই প্রাঙ্গণে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা আরো বরেণ্য ব্যক্তির কবর রয়েছে। সেখানে গেলে এবং নিরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে আসেন, দেখবেন সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে।

নাগরিকত্ব হিসেবে নজরুল প্রথমে ব্রিটিশ ভারতীয়, পরে ভারতীয় এবং এরপর বাংলাদেশী হিসেবে তাঁর ইহকালীন জীবনের সমাপ্তি হয়। উচ্চ প্রতিভার অধিকারী নজরুল সচেতন জীবন পেয়েছিলেন মাত্র ৪২ বছর। তিনি ওই বয়সে এসে মস্তিষ্কের এক দূরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হন। এরপর কবি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং কবি আর সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেননি। সেদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায়, নজরুলের সৈনিক জীবনের শেষে সাহিত্যে মগ্ন কবিকে সাহিত্য চর্চায় পাওয়া যায় ২০ থেকে ২৩ বছর।

এতো অল্প সময়ের মধ্যে কবি কাজী নজরুল সাহিত্যের সকল শাখায় প্রকাশিত ও বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় তিন হাজারের (মতান্তরে চার হাজার) অধিক গান রচনা করেছেন যা বিশ্বে বিরল প্রতিভা। তিনি তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে এখনও মানুষের মনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে হাজার হাজার নজরুল রূপে উদ্ভাসিত হন। তিনি সশরীরে না থেকেও তাঁর গানে ও কবিতায় এখনও সংগ্রামী। কাজী নজরুল ইসলাম এবং তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা শতাব্দীর পথ পাড়ি দিয়ে সহস্রাব্দের পথে ছুটে চলা ধুমকেতু। যেখানে অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় সেখানে মানুষ গেয়ে উঠে-
‘বলবীর/চির উন্নত মম শির।’

লেখক – মোহাম্মদ আব্দুল হক


সংবাদটি পড়ে ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

https://www.booked.net

+22
°
C
+22°
+19°
London
Monday, 29

 

See 7-Day Forecast