৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৯শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

বয়কটের মুখে পিছু হটছে মোশাররফপন্থিরা

newsup
প্রকাশিত অক্টোবর ৩১, ২০২১
বয়কটের মুখে পিছু হটছে মোশাররফপন্থিরা

নিউজ ডেস্কঃ সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দোসরদের বয়কট করে নতুন পথে হাঁটতে শুরু করেছে ফরিদপুর আওয়ামী লীগ। এই স্লোগানে শামিল হয়েছে সব শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষও। সরকারি দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে একযোগে মাঠে নেমেছেন। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের যেসব নেতাকর্মী এতদিন কোণঠাসা ছিলেন তারাও মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়ে এতদিন যারা টুঁ শব্দ করার সাহস করতেন না, তারাও এখন মুক্ত স্বাধীন। নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে প্রশাসন। এক্ষেত্রে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান, বিপিএমের ভূমিকা অনন্য। তিনি শক্ত হাতে নিরপেক্ষভাবে সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।

তথ্যানুসন্ধান এবং নানা পেশা ও মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী থাকাবস্থায় আওয়ামী লীগের একশ্রেণির হাইব্রিড নেতাকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, মাস্তানি ছিল যাদের নিত্যদিনের কাজ। সে সময় তাদের মুখের কথায় ছিল শেষ কথা। তাদের অঙ্গুলি হেলনে ফরিদপুরের সবকিছু চলত। প্রশাসন ছিল হাতের ক্রীড়নক। ‘মন্ত্রীর লোক’ বলে কেউ এসব দুর্বৃত্তের টিকিটি স্পর্শ করতে পারত না। শত অন্যায় করলেও কারও কথা বলার সাহস ছিল না। তবে যারা বুক চেতিয়ে সাহস দেখিয়ে প্রতিবাদ করেছেন তাদের চরমভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। দলের প্রতিবাদী নেতাকর্মী থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের সাহসী সাংবাদিকদের চরম মাশুল দিতে হয়। শারীরিকভাবে আঘাত করা ছাড়াও অনেকের বাসাবাড়িতে হামলা করা হয়। কিন্তু ‘ওরা মন্ত্রীর লোক’ বলে তাদের কিছু হয়নি। দম বন্ধ হওয়া অবর্ণনীয় সেই দুঃশাসন চলাকালে অনেকে ধরে নিয়েছিলেন হয়তো জীবদ্দশায় এর প্রতিকার কিংবা বিচার দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু না। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর হস্তক্ষেপে সন্ত্রাসের বরপুত্ররা রাতারাতি একেবারে আকাশ থেকে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে। রাতারাতি ভেঙে পড়ে আশ্রয়-প্রশ্রয়ের শক্ত ঘাঁটি। শক্তির কালো আঁধার থেকে একে একে সবাইকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কঠিন বার্তা দিয়ে মাঠে নামে তদন্ত কমিটি। বাকিটা ছিল ফরিদপুরবাসীর জন্য নতুন এক ইতিহাস।

জানা গেছে, এখন পর্যন্ত পুলিশের শুদ্ধি অভিযানে যেসব রাঘববোয়াল গ্রেফতার হয়েছে তাদের লুকিয়ে রাখা এবং নামে-বেনামে থাকা সহায়-সম্পত্তির খোঁজে দুদক মাঠে সক্রিয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুদকের চৌকস সদস্যরা পালিয়ে থাকা অবশিষ্ট অপরাধীদের তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। এই যখন অবস্থা, তখন মন্ত্রী মোশাররফপন্থিদের সমর্থকরাও পিছু হটতে শুরু করেছে। কেউ কেউ রঙ বদল করে নতুন প্ল্যাটফরমে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। তবে ফরিদপুরে একটি সুস্থধারার রাজনীতি গড়ে তুলতে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। বলা হচ্ছে, রাজনীতি পরিচালিত হবে প্রতিটি দলের নীতি-আর্দশের ভিত্তিতে। কিন্তু ফরিদপুরের মাটিকে আর সন্ত্রাসের ঘাঁটি বানাতে দেওয়া হবে না।

ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত এবং তার ভাই ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সভাপতি ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের বিরুদ্ধে দুদক অবশ্য ৭২ কোটি টাকার মামলা আগেই করেছে। পরে গত বছরের ৭ জুন বরকত-রুবেলকে আটকের পর সিআইডি ২৬ জুন দুই হাজার কোটি টাকার অর্থপাচার মামলা দায়ের করে। চলতি বছরের ৩ মার্চ সিআইডি এ বিষয়ে চার্জশিট দাখিল করেছে। মামলায় ১০ জন আসামির মধ্যে ৫ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে।

সিআইডির একটি সূত্র জানায়, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে রুবেল-বরকত, তাদের পরিবারের সদস্য, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাইবোন, মায়ের নামে ২০০৮ সাল থেকে আটকের আগ পর্যন্ত কী পরিমাণ জমি দলিল হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়। তারা জমির দলিল নম্বর, পরিমাণ, মৌজা ও খতিয়ান উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়। সেখান থেকে জমির হিসাব পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর মাধ্যমে কী পরিমাণ টেন্ডার পেয়েছে তার তালিকাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ ক্যাপ্টেন বাবুল বলেন, ‘ফরিদপুরের সেই প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে একটা হযবরল অবস্থার যাত্রা শুরু হয়। যার রেশ অবশ্য কাটতে শুরু করেছে। তবে গত ১২ বছরে ফরিদপুরের রাজনীতি একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে একটি পক্ষ। তাই এ বিষয়ে কথা বলতে আর ইচ্ছে করে না। এখন শুধু ক্ষমতা আর টাকা-পয়সার জন্য নেতাকর্মীরা লড়াই করছেন। সমাজে চাটুকারের অভাব নেই। রাজনীতি এতটা নোংরা পর্যায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, এটাকে রীতিমতো ব্যবসা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। রাজনীতি মানেই এখন টাকা কামানোর হাতিয়ার। এসব কারণে এখন আর যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। রাজনীতিতে ভালো মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। এজন্য ভবিষ্যৎ রাজনীতি কতটা ভালো হবে তা বলা মুশকিল।’

জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহিরুল হক শাহাজাদা মিয়া বলেন, ফরিদপুরে যারা হেলমেট বাহিনী তৈরি করে বিএনপি নেতাদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার করেছে, বাড়িতে গুলি চালিয়েছে, তাদের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে জেলাবাসী। আমার বাড়িতে বোমা রেখেও হয়রানি করা হয়েছে। এক বছর আগে পুলিশের শুদ্ধি অভিযানে অনেকে ধরা পড়েছে। এভাবে অত্যাচারী রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা ধরা পড়ুক। প্রশাসনের কাছে সাধারণ মানুষের এটাই চাওয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা এ ধরনের অন্যায়-অত্যাচার থেকে বেরিয়ে সুস্থ রাজনীতি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আগামী দিনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনও চাই।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবল চন্দ্র সাহা বলেন, ‘তৎকালীন মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দুঃশাসন চলাকালে মানুষ কথা বলতে পারত না। ন্যায্য কথা বলায় আমার বাড়িতেও হামলা করা হয়। এরপর অনেকে আটক হয়েছে। সেই পরিস্থিতি এখন নেই। এই অনাচার থেকে ফরিদপুরবাসী এখন মুক্ত।’

পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান বিপিএম বলেন, ‘সন্ত্রাসী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। ইতোমধ্যে মানি লন্ডারিং মামলার চার্জশিটও আদালতে দাখিল করেছে সিআইডি।’


সংবাদটি পড়ে ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

https://www.booked.net

+22
°
C
+22°
+19°
London
Monday, 29

 

See 7-Day Forecast