১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

লোকমান কি বেঁচে আছো …….. ??? রিয়াদ আহাদ

Syed
প্রকাশিত আগস্ট ৮, ২০২১
লোকমান কি বেঁচে আছো …….. ???  রিয়াদ আহাদ

এক মৃত্যু পথের যাত্রী
মাত্র চার মাস বেঁেচ থাকার ডাক্তারদের দেওয়া বেঁেধ দেওয়া সময়ের মধ্যে এক মৃত্যু পথযাত্রী মানব সন্তানকে নিয়ে স্পেন থেকে চ্যানেল এসের জন্য এই প্রতিবেদনটি তৈরী করেছিলাম ২০০৮ সালে একেবারে এক যুগ অর্থ্যাৎ বারো বছর আগে। তখন স্ব-পরিবারে স্পেনের বার্সেলোনায় থাকতাম। প্রতিদিন একটু দেরীতে ঘুম থেকে উঠার অভ্যেস থাকায় সম্ভবতঃ দুপুরের দিকে দোকানে যাওয়ার পর আমার এক ষ্টাফ জানালেন, একজন লোক দু‘দফা এসে আমাকে খোঁজ করে গেছে ; আমাকে নাকি উনার ভীষম প্রয়োজন। বিকেলের দিকে বিধ্বস্থ আর উসখুস অবস্থায় একজন লোক দোকানে এসে আমাকেই খোঁজলেন। আমার সাথে পরিচয় হয়েই কথা শুরু করার মধ্যেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন ঐ ভদ্রলোক। তাঁর নাম ছিলো লোকমান হোসেন। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায়ই ডাক্তার তাঁকে জানিয়ে দিয়েছে সে সর্ব্বোচ্চ চার মাস বাঁচতে পারে। দেশে তাঁর স্ত্রী তিন কন্যা আর মা বাবাও আছেন। তিনি একেবারে দেশে চলে যেতে চান ; কিন্তুু কোনো অর্থ তার কাছে নেই। নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে বিভিন্ন দেশের সীমান্ত মাড়িয়ে জীবন বাজী রেখে অবৈধ পথেই তিনি স্পেনে ডুকেন। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় কোনো কাজকর্মও করতে পারেননি। এখন এই শেষ সময়ে পৃথিবী অন্ধকার দেখা লোকমান হোসেন কিভাবে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। তাঁর সাহায্য প্রয়োজন; আমি যেনো তাঁকে একটু সাহায্যের ব্যবস্থা করে দেই। লোকমান হোসেনের কান্নাভরা কথাগুলো আমাকে খুবই আলোড়িত করলো। শরীরের দিকে তাঁকিয়ে মনে হলো সে অনেকদিন খায়ও নি। দোকানের পাশেই ছিলো রেষ্টুরেন্ট ; সেখানে নিয়ে গিয়ে তাঁকে পেঠ পুরে খাওয়ালাম। প্রতিশ্রæতি দিলাম সাধ্যমতো চেষ্টার করার। স্পেনে তখন খুবই অর্থনৈতিক মান্দা থাকায় সেরকমভাবে না পারলেও পরিচিতি বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহ করে সম্ভবতঃ তাঁর দেশে যাওয়ার টিকেটসহ সামান্য কিছু অর্থ দেওয়াও সম্ভব হয়েছিলো। তাকেঁ বলেছিলাম বিলেত প্রবাসী বাঙালীদের আর্থিক অবস্থা স্পেনের চাইতে ভালো। সে তাদের কাছে সাহায্য চাইলে কিছু সাহায্য হয়তো আসতে পারে। আমি তাঁর জন্য চ্যানেল এসে একটা প্রতিবেদন করে পাঠালে হয়তো তারা কিছু সাহায্য করবেন। সে কারণে এই প্রতিবেদনটিতে লোকমান হোসেন লন্ডনের ভাই বলে সম্বোধন করে সাহায্য চেয়েছিলো। কিন্তু সম্ভবতঃ একটু বেশী দীর্ঘ প্রতিবেদন হওয়ায় চ্যানেল এসের তৎকালীন নিউজ বিভাগ তা আর সম্প্রচার করেনি। আজ রাতে চ্যানেল এসে রিয়েলিটি উইথ মাহি অনুষ্টানে চ্যানেল এসের ফাউন্ডার মাহি ফেরদৌস জলিলের অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিরুপ মন্তব্য বিষয়ে টক শো করার সময় হঠাৎ মনে পড়লো লোকমান হোসেনের কথা। আহারে বেচারা তখন অবৈধ থাকায় স্পেনের সরকার থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পায়নি। আমরা কমিউনিটির মানুষেরাই তাঁকে সাহায্য করেছিলাম। কেনো জানি কম্পিউটারে বসে আর্কাইভে লোকমান হোসেনের এই প্রতিবেদনটা খোঁজলাম। সেসময় টিভি রির্পোটিং-এ পরিপক্কতার বেশ ঘাঠতি ছিলো,এখনকার মতো টেকনিকেল সাপোর্টও ছিলো কম। তবুও চেষ্টা করেছিলাম প্রতিবেদনটিতে লোকমান হোসেনের আহাজারীটুকু ভালোভাবে তুলে ধরার।

 

লোকমান হোসেনের বিষয়ে আর কোনো খোঁজ পাইনি কিংবা ব্যস্ততার কারণে রাখাই হয়ে উঠেনি। তাঁর দেশের বাড়ী কোথায় ছিলো তাও মনে পড়ছেনা। তবে আজ বারো বছর পর ওর অশ্রæসিক্ত নয়ন আর আবেগময় কথাগুলো বার বার চোখে ভেসে আসছে। ‘‘ভাই আমি আর বাঁচবো না,আমাকে একটু দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।‘‘ ‘‘ভাই…আমার তিনটি মেয়ে একটি আবার বিবাহ উপযুক্ত – আর বাকী দুটোর একটি পাচঁ বছরের,অন্যটি আড়াই বছর – ওদের কি হবে। ‘‘

লোকমান কি বেঁচে আছো …….. ??? নাকি মরেই গেছো। তোমার সন্তানগুলোই বা কেমন আছে। বারো বছর আগে সে যদি মৃত্যুবরণ করেই থাকে, তাহলে তো তার ছোটো মেয়েটির বয়স এখন সাড়ে চৌদ্দই হবে, মেঝোটির সতেরো। বড় মেয়েটিকে কি বিয়ে দিয়ে যেতে পেরেছিলো। ওর স্ত্রী কিংবা বাবা মা ই বা কেমন আছে। আচ্চা কাউকে যদি কখনো বলা হয় তুমি আর চার মাস বাঁচবে তবে তাঁর কি অবস্থা হবে। তাঁর পরিবার পরিজনই কিভাবে তা মেনে নেবে।

নশ্বর এই পৃথিবীতে আমরা সকলেই ক্ষনিকেরই যাত্রী। মানুষ কতো বছরই্ বা আর বাঁেচ। বড়জোর ষাট সত্তুর। আমাদের কমিউনিটিতে সত্তুরের পর আশি ছোঁয়া মানুষদের সংখ্যা তো এখন একেবারেই নগন্য। আর করোনার এই মহামারীর মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত হওয়া প্রিয়জনদের তালিকা বাড়ছেই। পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া প্রিয়জনদের সংখ্যাও কম দীর্ঘ নয়। মনে ছেদ পড়লো – আরে আমার বয়সটাও তো বাড়ছেই। যদি আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখে পাঁচ বছরের মধ্যেই তো অর্ধশতকে পৌছে যাবে। আর কতো বছর আল্লাহ বাঁিচয়ে রাখবেন তা বলা মুস্কিল। তবে একদিন আমাদের সাবাইকেই এই ধরা ছেড়ে চলে যেতে হবে। ধ্যৎ ..ভাবনাগুলো কেনো জানি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। লোকমান হোসেনের প্রতিবেদন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ভাবছি – পৃথিবীতে এরকম অসংখ্য লোকমান হোসেনরা আছে। তাদের জন্য আমরা কি করতে পারছি কিংবা করছি। তারা মৃত্যুর প্রহর গুনছে অথচ আমরা অধিকাংশরাই সেই প্রহর না গুনে সুস্থ্য থেকে যাওয়ায় ¯্রষ্টার আরাধনা করছিনা,আদায় করছিনা আল্লাহর শুকরিয়াও। অনেকেই বিত্ত বৈভত্তের অধিকারী হয়ে অসহায়দের সাহায্য না করে নিজেদের নিয়েই মগ্ন হয়ে আছি।
এই প্রতিবেনটি লিখতে গিয়ে লোকমান হোসেনকে নিয়ে কল্পনায় একটি গল্পের পটভূমি মনে আকঁছি। সময় সুযোগ হলে হয়তো তা লিখবো।


বিঃ দ্রঃ কম্পিউটারে আমার আর্কাইভে লোকমান হোসেনের কান্নাজড়িত কথাগুলো শুনে আমি নিজেও অনেক আবেগøাপুত হয়ে পড়ি; অজান্তেই অশ্রæদুটি সিক্ত হয়ে উঠে। লোকমান হোসেনের সাহায্য প্রাপ্তির জন্য নয়; বারো বছর আগে স্পেনের বার্সেলোনা থেকে করা এই প্রতিবেদনটিতে আমি শুধু মানুষের জীবনের ক্ষনস্থায়ীত্বের বিষয়টুকু তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। আর তখন কিংবা কখনো এই প্রতিবেদনটি কোথাও প্রচারীত না হওয়ায় ফেইসবুকের বন্ধুদের জন্য এটা আপলোড করি। তথাপি যারা তাকে সাহায্য প্রদানের জন্য নানাভাবে যোগাযোগ করেছেন তাদের কাছে নিরন্তর কৃতজ্ঞতা। আসলে মানুষ যে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে চায়,লোকমান হোসেনের জন্য সাহায্য প্রদানে ইচ্ছুকদের যোগাযোগই এর প্রমাণ। জয়তু মানবতা। যারা যোগাযোগ করেছেন তাদের বলবো,আমাদের অভাগা দেশটাতে অসহায় দরিদ্র মানুষদের সংখ্যা অগনিত। আপনার আশেপাশেই এমনকি আত্মীয় স্বজনদের মাঝেও এরকম অনেক লোকমানরা আছে; আছে কন্যাদায়গ্রস্থ অনেক পিতার আহাজারী,বিনা চিকিৎসায় বিছানায় শায়িত ধুকে ধুকে মরতে বসা জ্বলজ্যান্ত স্বামীর শিয়রে বসা স্ত্রীর অব্যক্ত কান্না,ওষুধের অর্থ যোগাড় করতে না পারা মৃত্যুপথযাত্রী কোনো পিতার নিস্পাপ শিশুদের হ্রদয় বিদারক চাহনী কিংবা অর্থভাবে চিকিৎসা করতে না পারা চোখের সামনে অসুস্থ্য সন্তানের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা কোনো জন্মদাতার কষ্টের বেসাতী — আরো কতো ক্বি !!! এই প্রদিবেদনটি দেখে কেউ যদি তার এলাকায় কিংবা তার স্বজনদের নুন্যতম এরকম পরিস্থিতিতে থাকা একজনের জন্য হলেও সাহায্যের হাত প্রসারিত করেন, তাহলে মনে হবে – হ্যা আমার এই প্রতিবেদনটি করা স্বার্থক হয়েছে। আর আমিও আল্লাহর কাছে আপনাদের ঐ সাহায্যের ভাগীদার হতে পেরেছি।

লেখক ঃ নির্বাহী সম্পাদক বাংলা কাগজ, মিডল্যান্ডস প্রতিনিধি চ্যানেল এস ও যমুনা টিভি।


সংবাদটি পড়ে ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

https://www.booked.net

+22
°
C
+22°
+19°
London
Monday, 29

 

See 7-Day Forecast