২০শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৪ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

প্রবীণরা বোঝা নন, সম্পদ

newsup
প্রকাশিত অক্টোবর ৯, ২০২১
প্রবীণরা বোঝা নন, সম্পদ

নিউজ ডেস্কঃ  এবার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে উদ্যাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীতে আমরা অন্যরকম এক বাংলাদেশকে দেখছি।

যে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার বাংলাদেশ। তবে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে চলা করোনা অতিমারির কারণে দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি শ্লথ হয়ে গেছে। অনেকে চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

দারিদ্র্য বেড়েছে। এ করোনায় সবচেয়ে বেশি মানবেতর জীবনযাপন করছেন প্রবীণ নারী ও পুরুষ। আমাদের মতো দরিদ্রপ্রবণ দেশে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান সমস্যাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় প্রবীণরা প্রতিনিয়ত জর্জরিত হচ্ছেন। এ সময়টাতে প্রবীণদের দুর্দশা সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে প্রবীণ নারীরা দুঃখ-কষ্ট, বৈষম্য ও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন বেশি। প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন, সমাজে প্রবীণদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাসহ তাদের স্মরণ করার জন্য প্রতিবছর নতুন নতুন থিম নিয়ে ফিরে আসে এ দিবসটি।

প্রবীণদের সমস্যা এবং পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তুলে ধরে সভা-সেমিনারসহ অনেক লেখালেখিও হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। প্রবীণদের কথা তেমন করে কেউ ভাবে না।

এবার আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে- ‘ডিজিটাল সমতা, সব বয়সের প্রাপ্যতা’, অর্থাৎ সব বয়সের জন্য প্রযুক্তিগত সমতা বিধান করা।

প্রযুক্তির এ যুগে প্রবীণ জনগোষ্ঠী প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে প্রবীণরা প্রযুক্তির সব সুযোগ-সুবিধা কি ভোগ করছেন?

নাকি সেই পরিবেশ বা পারিপার্শ্বিকতা আছে? এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়-আমাদের সংবিধানে জনগণের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বেশ কয়েকটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে প্রবীণ জনগোষ্ঠী কি এসব মৌলিক অধিকার বা সুবিধাগুলো যথাযথভাবে পাচ্ছে বা ভোগ করছে? প্রযুক্তিগত সমতা বিধান করা তো অনেক পরের কথা, এর আগে প্রবীণরা তাদের যাপিত জীবনে যে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট প্রতিনিয়ত ভোগ করছেন, তা থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পর প্রযুক্তির প্রাপ্যতার বিষয়টি আসতে পারে।

বাংলাদেশে এ দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, আমাদের সমাজে প্রবীণরা অত্যন্ত অবহেলিত, বঞ্চিত ও উপেক্ষিত। অথচ সমাজ গড়ার মূল কারিগর প্রবীণ জনগোষ্ঠী। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেনদের যেভাবে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়, তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়, আমাদের দেশে সেভাবে করা হয় না। এক কথায়, আমাদের দেশে প্রবীণদের বোঝা মনে করা হয়। যে প্রবীণরা তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টায় শ্রম ও মেধা দিয়ে এ দেশ, এ সমাজ ও পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, আজ তারা অবহেলিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত।

বাংলাদেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা হলো জনসংখ্যার বার্ধক্য। এটি আমাদের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কতটা প্রস্তুত? এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সরকারকে চলমান করোনা পরিস্থিতি এবং দুর্মূল্যের বাজারকে বিবেচনায় নিয়ে প্রবীণদের জন্য উল্লেখযোগ্যহারে সার্বজনীন বয়স্কভাতা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ রাখার বিষয়ে বাজেটের আগে অনেক লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বর্তমান সরকার প্রবীণদের সার্বিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৩ সালে পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ও প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, দারিদ্র্যমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বিগত আট বছরেও এ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। এ নীতিমালা সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। আমাদের দেশে অনেক আইন আছে; কিন্তু এর যথাযথ বাস্তবায়ন বা প্রয়োগ নেই। ১৯৮২ সালে প্রবীণবিষয়ক বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ভিয়েনায়। এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল বার্ধক্য, স্বাস্থ্য সমস্যা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব ইত্যাদি বিষয়কে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ২০২১ সালে এসেও প্রবীণরা তাদের সামাজিক মর্যাদা বা স্বীকৃতি পাচ্ছেন না।

ব্রিটিশ সরকার এদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন প্রথা চালু করলেও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো ভাতা প্রচলন করেনি। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকার দুস্থ ও বয়স্ক প্রবীণদের জন্য সার্বজনীন ভাতার প্রচলন করে এবং সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের বয়স ৫৭ থেকে ৫৯ বছর করে। সরকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করেছে; কিন্তু এর বাইরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের যারা অর্থ কষ্টে পড়ে মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছেন, তাদের জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে? সমাজে অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রবীণ রয়েছেন যারা তাদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজের ও দেশের উন্নয়নে কাজ করতে চান; কিন্তু তাদের কথা সরকার ভাবছে না। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ, মেধাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের জাতীয় পর্যায়ে তালিকা করে ‘মেনটর’ হিসাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। এতে করে তারা নিজেদের কর্মে নিয়োজিত করার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ তথা দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারেন। সমাজে তারা আর বোঝা হিসাবে বিবেচিত হন না। এ দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সরকারকেও দক্ষ, অভিজ্ঞ, কর্মঠ ও মেধাসম্পন্ন প্রবীণদের কাজে লাগাতে হবে।

প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে হাসপাতালগুলোতে প্রবীণ কর্ণারের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। কারণ করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন এ প্রবীণ জনগোষ্ঠী। পাশাপাশি প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ বাস্তবায়নের দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে এবং পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসার জন্য গণমাধ্যমে প্রচার/প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

প্রবীণরা সমাজে বোঝা নন, সম্পদ। এ বিষয়টি সবাইকে বোঝাতে হবে। প্রবীণদের সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার বিষয়ে প্রথমে পরিবার এবং এরপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে। এজন্য প্রবীণ পুরুষ ও নারীদের সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের কথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিশোর বয়স থেকে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিলে পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত হবে-এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।


সংবাদটি পড়ে ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
October 2021
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

https://www.booked.net

+22
°
C
+22°
+19°
London
Monday, 29

 

See 7-Day Forecast