এলডিসি উত্তরণের আগেই ঋণ ও রাজস্ব সংকটে বাংলাদেশ: এডিবি

প্রকাশিত: ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ, মে ২৪, ২০২৬ | আপডেট: ১২:০৮:পূর্বাহ্ণ, মে ২৪, ২০২৬

অর্থনীতি ডেস্ক

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের আগেই দেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব ও ঋণজনিত চাপ বাড়ছে বলে সতর্ক করেছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। ম্যানিলা-ভিত্তিক এই বহুজাতিক ঋণদাতা সংস্থার মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ দেশের মোট জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রায় ৪১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ এবং দুর্বল রাজস্ব আদায়ের কারণেই মূলত এই বড় ধরণের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

চলতি মাসে প্রকাশিত এডিবির ‘বাংলাদেশ অ্যাট আ ক্রসরোডস অব রিফর্মস’ (সংস্কারের মহাসড়কে বাংলাদেশ) শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

কাঠামোগত দুর্বলতা ও মাঝারি মাত্রার ঝুঁকি

এডিবি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে সামগ্রিক ও বাহ্যিক ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই ‘মাঝারি মাত্রার’ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এছাড়া নিকট ভবিষ্যতে যেকোনো ধরণের আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাও দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ সীমিত। তবে সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে যে, ঋণের এই ঝুঁকি কোনো সাময়িক উত্থান-পতনের কারণে নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে তৈরি হয়েছে।

সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর আদায়ের অত্যন্ত দুর্বল চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত (Tax-to-GDP ratio) অন্যতম সর্বনিম্ন, যা মাত্র ৭.৫ শতাংশ। এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে:

  • দুর্বল কর কমপ্লায়েন্স (নিয়ম মেনে চলার অভাব)

  • খণ্ডিত কর প্রশাসন এবং

  • ম্যানুয়াল বা সনাতন পদ্ধতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।

‘আয়কর আইন ২০২৩’ এবং ডিজিটাল কর সেবার মতো কিছু সংস্কার আনা হলেও কর প্রশাসন এখনো পুরোপুরি আধুনিক হতে পারেনি। ফলে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরই মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ শতাংশের বেশি রাজস্ব কম আদায় হচ্ছে।


বেসরকারি খাতে ঋণ সংকটের শঙ্কা (Crowding-out Risk)

সরকার তার ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ক্রমাগত ঋণ বাড়িয়ে চলেছে। এডিবি বলছে, এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে। ব্যাংকগুলোর সাথে সরকারের এই অতিরিক্ত ঋণ সংযোগের ফলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে, যা অর্থনৈতিক ভাষায় ‘ক্রাউডিং-আউট’ ঝুঁকি তৈরি করছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান দেনা ও সরকারি গ্যারান্টিও রাজকোষের ওপর বাড়তি ঝুঁকি চাপাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী বড় হুমকি: জলবায়ু ও দুর্যোগজনিত ধাক্কা

এডিবির পরিচালিত ‘স্ট্রেস টেস্ট’ বা চাপ সহনশীলতার পরীক্ষায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ঋণ টেকসই রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ধাক্কা

এডিবির মূল্যায়ন: “আর্থিক সুশাসন, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ প্রশাসনের ধারাবাহিক দুর্বলতা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করছে। এলডিসি উত্তরণের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো বাংলাদেশের সার্বিক আর্থিক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।”