হরমুজের ‘সহনশীলতার লড়াইয়ে’ কে জিতবে যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরান ?

প্রকাশিত: ২:০৭ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২৬ | আপডেট: ২:০৭:অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২৬

অনলাইন ডেক্স:

 

 

 

অচলাবস্থা, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা—এভাবেই এখন বর্ণনা করা হচ্ছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে। ইরানের উপকূলবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকট এখন চতুর্থ মাসে গড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উভয় পক্ষ কার্যত একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অবরোধ আরোপ করেছে।

 

 

ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি আদায় করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলবাহী জাহাজ ঠেকাতে নৌ অবরোধ জোরদার করেছে। তবে এই দুই পক্ষের চাপ প্রয়োগের কৌশল এখন পর্যন্ত কোনো নির্ণায়ক ফল আনতে পারেনি।

 

 

 

কিছু ইরানি জাহাজ এখনও অবরোধ এড়িয়ে চলাচল করছে। আবার আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি এশীয় শিপিং কোম্পানি ইরানকে টোল দিতে সম্মত হয়েছে।

 

 

আলোচনা থমকে, বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা

হরমুজ পুনরায় উন্মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে ভঙ্গুর আলোচনা চলছিল, তা একাধিকবার স্থগিত হয়েছে। এতে করে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা নিরসনে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক প্রস্তাব করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই আপসের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দেয়নি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ডানিয়া থাফার মনে করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার সামরিক হুমকি বরং উল্টো ফল দিয়েছে।

ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, “ইরান এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা হিসেবে দেখছে। তারা মনে করছে, ওয়াশিংটনের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের ইচ্ছা নেই।”

 

 

 

 

 

চাপে ট্রাম্প প্রশাসন

যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় মিত্ররা আরও সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি মার্কিন রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করছে।

 

 

 

প্রতিদিন শত কোটি ডলার হারাচ্ছে ইরান

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনীতিও ভয়াবহ চাপে রয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো মিয়াদ মালেকির হিসাব অনুযায়ী, ইরান প্রতিদিন প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বাণিজ্যিক ক্ষতির মুখে পড়ছে, যার বড় অংশই তেল রপ্তানি থেকে আসে।

শুধু মার্কিন অবরোধের কারণেই ৩৯ দিনে ইরানের প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলায় সৃষ্ট অতিরিক্ত প্রায় ১৪৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক বুরচু ওজচেলিক বলেন, “ইরান হয়তো সামরিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, কিন্তু তাদের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ সহ্য করার মতো শক্তিশালী নয়।”

 

 

 

 

উপসাগরীয় দেশগুলো উদ্বিগ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট এখন এক ধরনের ‘অপেক্ষার খেলা’-তে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দু’পক্ষই মনে করছে সময় তাদের পক্ষেই কাজ করবে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

তারা আশঙ্কা করছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তাদের অর্থনৈতিক সংস্কার ও পর্যটননির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনা এবং জাতিসংঘ-সমর্থিত উদ্যোগকে তারা সমর্থন দিচ্ছে।

 

 

 

আঞ্চলিক আধিপত্য চায় ইরান

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান শুধু বর্তমান সংঘাত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে নিতে চায়।

ডানিয়া থাফারের ভাষায়, “ইরান চায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে পুরো অঞ্চলকে আনতে।”

তবে ওয়াশিংটন এখনও হরমুজ পুরোপুরি উন্মুক্ত করা, ইরানের সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং বড় ধরনের ছাড় ছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করার অবস্থানে অনড় রয়েছে।

 

 

 

সাধারণ ইরানিদের দুর্ভোগ বাড়ছেই

সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছেন সাধারণ ইরানিরা। দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৫৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। টানা ৮০ দিনের বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বিভ্রাট চলায় সাধারণ মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

বুরচু ওজচেলিক বলেন, “ইরানের অর্থনীতি ও জনগণকে দীর্ঘমেয়াদি কষ্টের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে—এমন উপলব্ধি থেকেই তেহরান হরমুজ দিয়ে যাতায়াতে ফি আরোপের মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে।”

অন্যদিকে ডানিয়া থাফারের মতে, “ট্রাম্প এই যুদ্ধকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে দেখছেন, কিন্তু ইরান এটিকে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করছে।”

 

 

 

 

 

 

দ্যা ডেইলি স্টার অবলম্বনে তৈরী