এক দিনেই স্পেনে ৬০ হাজার অভিবাসীর প্রবেশ, সিউটায় মানবিক সংকট

প্রকাশিত: 7:49 PM, July 31, 2026 | আপডেট: 7:49:PM, July 31, 2026

 

 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

 

 

গত ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউটাতে প্রবেশ করেছেন। শুক্রবার সিউটার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই যাত্রাপথে অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর একযোগে প্রবেশে শহরটিতে মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে।

 

 

 

এই অভিবাসীর ঢল এমন এক সময়ে এসেছে, যখন স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট চলতি মাসে রায় দিয়েছে যে, সিউটা বা স্পেনের আরেকটি উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টাকালে সমুদ্রে আটকেপড়া অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এমন ‘তাৎক্ষণিক ফেরত’ (Pushback) নীতির সমালোচনা করে আসছিল।

 

 

 

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ পরিস্থিতিকে একটি ‘আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, সরকার সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে এবং যেসব ব্যক্তি বৈধ কাগজপত্র ছাড়া প্রবেশ করেছেন, তাদের আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় যত দ্রুত সম্ভব মরক্কোতে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

 

 

এদিকে ইউরোপের কয়েকজন নেতা এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, মানবপাচার চক্র দমন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ অভিবাসন নীতি আরও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টও স্পেনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

 

 

কেন সিউটা এত গুরুত্বপূর্ণ?

মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত সিউটা স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। এটি জিব্রাল্টার প্রণালির মাধ্যমে স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিঃসীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হলো সিউটা ও মেলিলা।

দীর্ঘদিন ধরেই সাব-সাহারান আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচতে ইউরোপে আশ্রয় বা উন্নত জীবিকার সন্ধানে এই রুট ব্যবহার করে আসছেন।

 

 

সীমান্তে চাপ ও মানবিক সংকট

সম্প্রতি সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টার সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সিউটার স্থানীয় প্রশাসন আগেই মাদ্রিদের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও জরুরি সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করেন, ফলে এলাকাজুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

স্পেনের জরুরি সেবা সংস্থাগুলো অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, চিকিৎসাসেবা, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে কাজ করছে। তবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমনে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শিশু ও পরিবারও এই দলে রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।

 

 

 

 

ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, ভূমধ্যসাগরীয় অভিবাসন সংকট ইউরোপের জন্য এখনও অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা Frontex দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, মানবপাচারকারী চক্রগুলো নতুন নতুন রুট ব্যবহার করে অভিবাসীদের ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা International Organization for Migration নিরাপদ ও মানবিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়ানো নয়, বরং অভিবাসনের মূল কারণ—দারিদ্র্য, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু সংকট—সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

 

 

আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত তীব্র, তবে মার্কিন নাগরিক মুক্তিতে কূটনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত