জয় দিয়ে আর্জেন্টিনা অধ্যায় শেষ করলেন মেসি, বিদায়ের রাতে গোলও করলেন
চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটা মেলানোর পরও লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যেন একটি বিশেষ মুহূর্তের অপেক্ষা ছিল—নিজ দেশের মাটিতে, প্রিয় সমর্থকদের সামনে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামা। সেই বিদায়ের রাতটিও নিজের মতো করেই স্মরণীয় করে রাখলেন ফুটবলের মহাতারকা। গোল করলেন, সতীর্থকে দিয়ে গোল করালেন এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর বেশেই মাঠ ছাড়লেন তিনি।
বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক স্তাদিও মনুমেন্টালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। ঘরের মাঠে এই জয়ের মধ্য দিয়েই জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচটি রাঙিয়ে দিলেন মেসি।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে আধিপত্য বিস্তার করে আর্জেন্টিনা। তবে প্রথম গোলের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ম্যাচের প্রথমার্ধের মাঝামাঝি পর্যন্ত। কর্নার থেকে আসা বল কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি। তাঁর গোলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে নেয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার আরও বাড়ায় আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠ থেকে তৈরি হওয়া এক আক্রমণ থেকে নিকো পাজ ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও আর্জেন্টিনার আক্রমণ থামেনি। একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে স্বাগতিকরা।
এরপর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। বক্সের ভেতর ফাউলের কারণে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পটকিক নিতে এগিয়ে আসেন অধিনায়ক মেসি। গ্যালারিজুড়ে তখন প্রত্যাশার ঢেউ। হাজারো সমর্থকের চোখ ছিল তাঁর দিকে।
ঠান্ডা মাথায় পেনাল্টি থেকে বল জালে জড়িয়ে দেন মেসি। জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের বিদায়ী ম্যাচেই গোল করে মুহূর্তটিকে আরও বিশেষ করে তুললেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। গোলের পর সতীর্থরা ছুটে যান তাঁর দিকে, আর গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন সমর্থকেরা।
৩-০ গোলের জয়টি তাই শুধু আরেকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের জয় ছিল না; আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে এক যুগের ফুটবল-অধ্যায়ের আবেগঘন সমাপ্তি।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির পথচলা ছিল দীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল। একসময় বড় টুর্নামেন্টে ব্যর্থতার কারণে সমালোচিত হওয়া সেই মেসিই পরবর্তীতে আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন একের পর এক বড় সাফল্য। কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং সর্বশেষ বিশ্বকাপ—জাতীয় দলের হয়ে সম্ভাব্য প্রায় সব বড় শিরোপাই নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন। বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে শিরোপা জেতার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছিল মেসির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এরপরও জাতীয় দলের হয়ে খেলে গেছেন তিনি, প্রতিটি ম্যাচেই দেখিয়েছেন কেন তাঁকে প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়।
তবে এবার সেই অধ্যায়ের পর্দা নামার সময়। আর সেই বিদায়ও হলো নিজের ঘরের দর্শকদের সামনে, নিজের প্রিয় জার্সিতে, গোল এবং জয় দিয়ে।
ম্যাচ শেষে মেসিকে ঘিরে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। গ্যালারিতে সমর্থকেরা তাঁর নামে স্লোগান দেন, আর মাঠে সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে উদযাপন করেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচটি যেন হয়ে উঠল তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি—দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, গোল করা, সতীর্থকে দিয়ে গোল করানো এবং শেষ পর্যন্ত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ার গল্প।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির এই বিদায় তাই কেবল একজন ফুটবলারের বিদায় নয়; এটি একটি ফুটবল-যুগের সমাপ্তির প্রতীক। যে জার্সিতে তিনি অসংখ্য রাতকে স্মরণীয় করেছেন, সেই জার্সিতেই শেষবারের মতো মাঠ ছাড়লেন তিনি—বিজয়ী হিসেবে, গোলদাতা হিসেবে এবং কোটি সমর্থকের হৃদয়ের নায়ক হয়ে।

