জগন্নাথপুরে নৌকাডুবি: দুই সহোদরসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার, গ্রামজুড়ে শোক

আলী আহমেদ আলী আহমেদ

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: 1:32 AM, August 3, 2026 | আপডেট: 1:32:AM, August 3, 2026

 

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পথে হাওরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া দুই সহোদরসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় পুরো ভবানীপুর গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে হৃদয়বিদারক পরিবেশ।

 

 

শুক্রবার (৩১ জুলাই) গভীর রাতে উপজেলার মইয়ার হাওরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। শনিবার দুইজন এবং রোববার সকালে আরও দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

 

রোববার সকালে উপজেলার মইয়ার হাওরের রুয়ারকারা এলাকা থেকে পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের মৃত জোগিন্দ্র দেবনাথের ছেলে হেমেন্দ্র দেবনাথ (৩০) এবং মৃত অনিল দেবনাথের ছেলে অধীর দেবনাথের (৪০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে শনিবার একই গ্রামের অধীরের বড় ভাই অরুণ দেবনাথের (৪৫) এবং মৃত সুবল দেবনাথের ছেলে সতীন্দ্র দেবনাথের (৬৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

 

 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাতে ভবানীপুর গ্রামের নয়জন ব্যক্তি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি কীর্তন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে ডিঙি নৌকায় করে বাড়ি ফেরার সময় পৌর এলাকার বৈঠাখালী এলাকায় পৌঁছালে নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় পাঁচজন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও অধীর দেবনাথ, তাঁর ভাই অরুণ দেবনাথ, হেমেন্দ্র দেবনাথ ও সতীন্দ্র দেবনাথ নিখোঁজ হন।

 

 

 

পরদিন শনিবার এবং রোববার পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের যৌথ উদ্ধার অভিযানে নিখোঁজ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

 

 

স্বজনদের আহাজারিতে ভারী পরিবেশ

সরেজমিনে ভবানীপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্নায় পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।

নিহত হেমেন্দ্র দেবনাথের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর স্ত্রী সম্পা রানী দেবনাথ বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। প্রতিবেশীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

সম্পা রানী দেবনাথ বলেন, “আট বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়। স্বামী কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাতেন। দুই সন্তানকে নিয়ে সুখেই ছিলাম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে আমি দিশেহারা। এখন এই অবুঝ দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?”

 

 

 

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ভবানীপুর গ্রামের নিশি দেবনাথ বলেন, “রাত ১০টার দিকে আমরা নয়জন কীর্তন শুনতে গিয়েছিলাম। রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে নৌকায় করে বাড়ি ফিরছিলাম। বৈঠাখালী এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। তখন হালকা বাতাস ছিল। মুহূর্তের মধ্যে ঢেউয়ের আঘাতে নৌকাটি ডুবে যায়। আমরা প্রাণ বাঁচাতে সাঁতরে তীরে ওঠার চেষ্টা করি। ভাগ্যক্রমে পাঁচজন বেঁচে গেলেও চারজন নিখোঁজ হন। পরে তাঁদের সবার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।”

 

 

 

প্রশাসনের বক্তব্য

জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসলাম উদ্দিন বলেন, “একই গ্রামের চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকা হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।”

এদিকে, একই গ্রামের চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, “আমার নির্বাচনী এলাকায় নৌকাডুবির মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে।”

 

 

আরও পড়ুন:জগন্নাথপুরে নৌকাডুবি, ২ জনের মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ২

আরও পড়ুন: টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জগন্নাথপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, বিদ্যালয়ে ব্যাহত পাঠদান