ইউরোপের স্বপ্ন ডুবল সাগরে জগন্নাথপুরের ৫ তরুনের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের মাতম

প্রকাশিত: ৭:২০ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২৬ | আপডেট: ৭:২০:অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২৬

 

 

আলী আহমদ জগন্নাথপুর:

স্বপ্নের ইউরোপে আর যাওয়া হলো না সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের ৫ তরুণের। লিবিয়া থেকে রাবারের বোটে করে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে পাঁচ তরুণের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

 

শনিবার নৌকাডুবির ঘটনার পর তাদের মৃত্যুর খবর পরিবারের লোকজন জানতে পারেন। সাগরে এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবারে শোকের মাতম চলছে।

 

৫ তরুণের মৃত্যুতে শুধু পরিবারের লোকজন কিংবা স্বজনরাই নয় পুরো জগন্নাথপুরবাসী শোকাহত।

 

মারা যাওয়া তরুণরা হলেন জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া মাঝপাড়া গ্রামের দোলন মিয়ার ছেলে নাইম মিয়া (২৪), একই গ্রামের শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক রেজা (২৩), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিঁয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ জয় (২৫) একই ইউনয়নের ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২) ও পাইলগাঁও (হাড়গ্রাম)গ্রামের প্রাক্তক শিক্ষক হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬)।

 

 

গতকাল রোববার দুপুরে সরজমিনে নিহত নাইমের বাড়ি চিলাউড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মা আকি বেগম ছেলের মৃত্যুতে কাউ-মাউ করতে কাঁদছেন। তাঁর বুক ফাটা কান্নায় কাঁদছেন স্বজনরাও। তিনি কান্না কণ্ঠে বলছিলেন, আমার ছেলেকে দালালরা মেরে ফেলেছে, তোমরা আমার নাইমকে এনে দাও। এসব বলে কান্নায় লুঠে পড়ছেন। স্বজনা অশ্রুভেজা চোখে তাঁকে সান্তনা দিচ্ছেন।

 

নাইমের বাবা দোলন মিয়া বলেন, জগন্নাথপুরের ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজুল ইসলামের সঙ্গে গ্রিসে পাঠার জন্য ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে জানুয়ারি মাসে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। জায়গা জমি বিক্রিতে এসব টাকা দিয়েছি। সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পর গ্রিসের গেম দেওয়ার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবী করে দালাল। দাবীকৃত টাকা পরিশোধ করার পরও গ্রিসে পাঠাতে টালবাহানা করে। অবশেষে ২১ মার্চ গেমে দেওয়া হয়। কথা ছিল গেমে দেওয়ার আগে আমাদেরকে জানানো হবে। কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। শনিবার জানতে পারি সাগরে আমার ছেলে মারা গেছে। তাঁর লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।এঘটনায় তিনি দালালের বিচার দাবী করেন।

 

একই গ্রামের ইজাজুল হক রেজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পিনপিনে নিরবতা। এলাকার লোকজন সমবেদনা জানাতে বাড়িতে ভির করছেন।

 

ইজাজুল হকের বাবা সামছুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছাতকের শক্তিগাঁও গ্রামের দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ৩ মাস আগে লিবিয়া পাঠিয়েছিলাম আমার ছেলেকে। সেখান থেকে গ্রিসে পাঠানোর কথা। সব টাকা পরিশোধ করা হলেও গ্রিসে পাঠানো নিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে দালাল। আমার ছেলে ঈদের আগে ‘বয়েস কলে’ জানায়, দালাল আমাকে খাওয়া দাওয়া দিচ্ছে না। খুবই কষ্ঠে আছি। আমার জন্য দোয়া । এরপর আমার ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি। আমরা দালালের সঙ্গে অনেক চেষ্ঠা করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। রাতে শুনি আমার ছেলে মারা গেছে।

প্রতিবেশী ফজলু মিয়া বলেন, দালাল সিন্ডিটেক ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে লোকজনকে প্ররোচিত করে অনেক পরিবারের সর্বত্র লুটে দিচ্ছে। তাদের কারণে অকালে ঝড়ছে কত তরতাজা প্রাণ। এদের বিরুদ্ধে আইনানুগত শাস্তি গ্রহনের দাবী করছি।

 

 

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, গতকাল (শনিবার) রাতে খবর পেলাম আমার ইউনিয়নের একই গ্রামের দুই যুবক সাগরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মারা গেছে। তাদের মৃত্যুতে গ্রামের মানুষ শোকাহত। তিনি বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানের কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে দালাল চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের ফাঁদে দেশের হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। অকালে প্রাণ হারাচ্ছে শত শত যুবক। দ্রুত সব দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

এদিকে পাইলগাঁও গ্রামের নিহত আমিনুর রহমানের বড় ভাই মিজানুর রহমান তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, দালালের মাধ্যমে বিদেশ যেতে আমাদের পরিবারের কেউ রাজি হবে না বুঝতে পেরে সে কাউকে না জানিয়ে লিবিয়া চলে যাওয়া।