‘দলের গোল দরকার, আপনার নয়’ — নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের পর রোনালদোকে ঘিরে নতুন বিতর্ক
স্পোর্টস ডেস্ক: পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে রেকর্ড-সমতা গড়া ষষ্ঠ অংশগ্রহণ শুরু হলো না উদযাপনের মধ্য দিয়ে; বরং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বুধবার গ্রুপ ‘কে’-এর উদ্বোধনী ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করার পর সমালোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন ৪১ বছর বয়সী এই তারকা।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত মুখ রোনালদো এখনও পর্তুগালের প্রধান আকর্ষণ হলেও, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে স্পষ্ট হয়েছে যে দলটি হয়তো অতিরিক্তভাবে তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ম্যাচের শুরুতে জোয়াও নেভেস পর্তুগালকে এগিয়ে দিলেও দ্বিতীয়ার্ধে ইয়োয়ানে উইসার হেডারে সমতা ফেরায় ডিআর কঙ্গো। এর মাধ্যমে আফ্রিকার দলটি বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম পয়েন্ট অর্জন করে।
ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে সাবেক ফরাসি স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি রোনালদোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। FOX Sports-এ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও ও ব্রুনো ফার্নান্দেসকে ঘিরে দ্বিতীয়ার্ধের একটি আক্রমণাত্মক মুহূর্ত তুলে ধরেন।
অঁরির মতে, রোনালদোর চলাফেরা দলের জন্য সুযোগ তৈরি করার বদলে নিজের গোল করার আকাঙ্ক্ষাকেই বেশি প্রকাশ করেছে।
“দলের গোল দরকার, আপনার নয়,” মন্তব্য করেন অঁরি। তিনি বলেন, রোনালদো এমনভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন যে তিনি ব্রুনো ফার্নান্দেসের পথেই চলে আসেন, ফলে রক্ষণভাগকে বিভ্রান্ত করার পরিবর্তে আক্রমণের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
অন্যদিকে সাবেক ঘানা আন্তর্জাতিক কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং আরও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। SBS Sport-এ তিনি বলেন, রোনালদোর ভূমিকা কমিয়ে তরুণ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া উচিত।
“রোনালদোকে ছাড়া পর্তুগাল আরও ভালো দল,” মন্তব্য করেন বোয়াটেং। তার মতে, রোনালদোর উপস্থিতির কারণে সতীর্থরা অনেক সময় সেরা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে তাকে বল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি পরামর্শ দেন, ম্যাচের শেষভাগে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামলে রোনালদো আরও কার্যকর হতে পারেন।
তবে সবাই সমালোচনার সঙ্গে একমত নন। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ওয়েইন রুনি বলেন, রোনালদোর অবস্থান নেওয়ার ধরন অনেক সময় সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়। তার মতে, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা এখনও রোনালদোর ওপর অতিরিক্ত নজর রাখে, যা অন্য খেলোয়াড়দের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে রুনি স্বীকার করেন, পুরো ম্যাচজুড়ে ডিআর কঙ্গো বেশি ক্ষুধার্ত ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে, যা পর্তুগালের সমস্যার অন্যতম কারণ ছিল।
পরিসংখ্যানও রোনালদোর সমালোচকদের পক্ষে কথা বলছে। তিনি টানা পঞ্চম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোলশূন্য থাকলেন। এছাড়া বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচ ধরে কোনো গোল করতে পারেননি। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২১ সালের জুনের পর থেকে বিশ্বকাপ বা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি কোনো নন-পেনাল্টি গোল করতে পারেননি।
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো তিনটি শট নিলেও একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। এটি তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ম্যাচ, যেখানে তিনি প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে কোনো সেভ করতে বাধ্য করতে পারেননি। ফলে তার অতীতের খ্যাতি ও বর্তমান কার্যকারিতার মধ্যে ব্যবধান নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
তবে পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজ অধিনায়কের পাশে রয়েছেন। অতীতে ধীর সূচনা করেও বিশ্বকাপ জয় করা দলগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি ম্যাচের ভিত্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। রোনালদোকে আগেভাগে তুলে নেওয়ার দাবিও তিনি নাকচ করে দেন।
তবুও রোনালদোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ নেই। ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা ও জোয়াও নেভেসের মতো সৃজনশীল ফুটবলারদের নিয়ে পর্তুগালের বর্তমান প্রজন্মকে ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই ফুটবল আইকনের প্রতি সম্মান বজায় রেখে দলীয় কৌশলের ভারসাম্য রক্ষা করা এখন মার্টিনেজের বড় চ্যালেঞ্জ।
রোনালদোর কিংবদন্তি মর্যাদা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পর্তুগালের জন্য তিনি এখনও সেরা বিকল্প কি না—সেই প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে।

