রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে সংলাপে কাজ করছে সরকার: খলিলুর রহমান
সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন
ঢাকা, ১৭ জুন : রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন।
সংসদে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি “জটিল, স্পর্শকাতর ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক ইস্যু”। এর সমাধান অনেকাংশে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
খলিলুর রহমান জানান, সংকট সমাধানের গতি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সর্বোপরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা।
তিনি বলেন, “রাখাইনে দীর্ঘদিন ধরে চলমান জাতিগত সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অনিরাপদ পরিবেশে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। তবে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে।”
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে যাতে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যদিও এ মুহূর্তে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, সরকারের লক্ষ্য হলো রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং স্থায়ীভাবে নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়া।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন।
খলিলুর রহমান অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং বিষয়টিকে মানবিক সংকট হিসেবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করেছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে ২০২৫ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সফরকালে তিনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। একই বছর ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে একটি বিশেষ অংশীজন সম্মেলন এবং ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যা রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক মানবিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলায় সমর্থন অব্যাহত রেখেছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি রাখাইনের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আরাকান আর্মির প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, যা অতীতে দেখা যায়নি।
প্রত্যাবাসনের ভিত্তি হিসেবে রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ ছয় ধাপে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে এবং ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জনকে মিয়ানমারের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সরকার তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে। তবে খলিলুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো তাদের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।”

