৫ আগস্ট ২০২৪: আন্দোলন থেকে ক্ষমতার পরিবর্তন—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ

প্রকাশিত: 8:17 PM, August 5, 2026 | আপডেট: 8:17:PM, August 5, 2026
প্রতীকি ছবি

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি যুগান্তকারী দিন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। দীর্ঘ টানা রাজনৈতিক উত্তেজনা, ছাত্র-জনতার আন্দোলন, সহিংসতা, প্রাণহানি এবং ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার পর সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে টানা প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের অবসান ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

 

 

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং সমাজজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। কেউ এটিকে গণঅভ্যুত্থানের বিজয় হিসেবে দেখেন, আবার আওয়ামী লীগসহ অন্যরা ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করে। ফলে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হলেও এটি যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সে বিষয়ে দ্বিমত খুব কম।

 

 

আরও পড়ুন: হবিগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে শিশুদের চিত্র প্রদর্শনী

 

 

দীর্ঘ শাসনের প্রেক্ষাপট

২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নতুন যাত্রা শুরু করে। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দলটি ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় থাকে। এই সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে যে নির্বাচনব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মহলের বিভিন্ন অংশ থেকেও এসব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ফলে উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণও ক্রমশ গভীর হতে থাকে।

 

 

 

 

কোটা আন্দোলন থেকে গণআন্দোলন

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। প্রথমদিকে তাদের দাবি ছিল কোটা সংস্কার। আন্দোলন দ্রুত দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, হতাহতের ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। আন্দোলনের পরিধি ধীরে ধীরে কোটার দাবির বাইরে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশে রূপ নিতে শুরু করে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে সম্পৃক্ত হন।

 

 

 

 

রক্তক্ষয়ী জুলাই

জুলাই মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, বিক্ষোভ, অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বহু মানুষের প্রাণহানি এবং বিপুলসংখ্যক আহতের ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, অনেক এলাকায় ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায় এবং সহিংসতা বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করে।

 

 

 

 

৫ আগস্ট: ক্ষমতার পালাবদলের দিন

৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেন এবং রাজধানীর দিকে অগ্রসর হন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

দিনের একপর্যায়ে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং দেশ ত্যাগ করেছেন। এরপর রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি তাৎক্ষণিক শূন্যতা তৈরি হয়। সেনাবাহিনী শান্ত থাকার আহ্বান জানায় এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক স্থানে উল্লাস মিছিল হয়। একই সময়ে বিভিন্ন সরকারি ভবন, রাজনৈতিক কার্যালয় এবং কিছু ব্যক্তিগত স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় বহু স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

 

 

 

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সূচনা

ক্ষমতার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।

এই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, প্রশাসনকে কার্যকর রাখা, বিচার ও সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া।

 

 

 

 

প্রশাসনে বড় পরিবর্তন

সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রদবদল শুরু হয়। মন্ত্রণালয়, পুলিশ, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। অনেক কর্মকর্তা বদলি হন এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করা হয়।

একই সঙ্গে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিভিন্ন তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

 

 

 

 

 

অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক প্রভাব

রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়ে। কয়েক সপ্তাহ ধরে শিল্পকারখানা, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং শেয়ারবাজারেও ওঠানামা দেখা যায়।

তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় গতি পেতে শুরু করে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানায় এবং সরকার বিনিয়োগ পরিবেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়।

 

 

 

 

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচিত হয়। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখা, মানবাধিকার রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তারা সহিংসতা বন্ধ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

 

 

 

 

এক বছর পর

৫ আগস্টের এক বছর পরও এই দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একদিকে এটি বহু মানুষের কাছে পরিবর্তনের প্রতীক, অন্যদিকে অনেকের কাছে এটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার সূচনাবিন্দু। তাই এই ঘটনাকে ঘিরে মূল্যায়ন এখনো রাজনৈতিক অবস্থানভেদে ভিন্ন।

তবে ইতিহাসের বিচারে ৫ আগস্ট ২০২৪ নিঃসন্দেহে এমন একটি দিন, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ, কারণ, ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণ করবেন। সেই আলোচনায় ৫ আগস্ট কেবল একটি তারিখ নয়, বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

 

আরও পড়ুন

সংসদীয় কার্যক্রমে গতি আনতে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা জোরদার