রূপপুরের ‘মিনি রাশিয়া’ পারমাণবিক স্বপ্নের ছায়ায় এক বহুসাংস্কৃতিক জনপদের গল্প
ইশ্বরদীর গ্রিন সিটিতে রুশ প্রকৌশলী, স্থানীয় চা-ওয়ালা ও বহুসাংস্কৃতিক জীবনের অনন্য মেলবন্ধন
নীল ত্রিপলের ছাউনি টাঙানো চায়ের দোকান, বাঁশের খুঁটিতে দাঁড় করানো ফল ও সবজির স্টল, ধুলোমাখা বাজারের ভিড়—দূর থেকে দেখলে এটিকে বাংলাদেশের আর দশটি গ্রামের বাজার বলেই মনে হবে। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বোঝা যায়, এখানে অন্য এক গল্প লেখা হচ্ছে। রাস্তার ধারের একটি টুলে বসে চা খাচ্ছেন একজন রুশ পারমাণবিক প্রকৌশলী। পাশেই এক কিশোর ফল বিক্রেতা সাবলীল রুশ ভাষায় দরদাম করছেন মস্কো থেকে আসা নিয়মিত ক্রেতার সঙ্গে। আর চায়ের দোকানদারের রুশ ভাষায় বলা কৌতুকে হাসিতে ফেটে পড়ছেন বিদেশি অতিথিরা।
পাবনার ইশ্বরদীর রূপপুর গ্রিন সিটির বিপরীতে গড়ে ওঠা এই বাজার এখন স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘মিনি রাশিয়া’ নামে। এখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পের সঙ্গে মিশে গেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির গল্প।
জঙ্গল থেকে বিশ্বজনীন জনপদ
আজ থেকে এক দশক আগেও এলাকাটি ছিল অনেকটাই নির্জন। ঝোপঝাড়ে ঘেরা গ্রামীণ পরিবেশ, সীমিত ব্যবসা-বাণিজ্য আর কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রাই ছিল এখানকার পরিচয়। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে বদলে যেতে শুরু করে পুরো জনপদের চিত্র।
প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হয় রূপপুর গ্রিন সিটি—বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের আবাসনের জন্য নির্মিত আধুনিক নগরায়ণ। বর্তমানে এখানে রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশের হাজারো নাগরিক বসবাস করছেন। তাদের উপস্থিতি বদলে দিয়েছে স্থানীয় অর্থনীতি, জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির ধারা।
বাজারের এক প্রান্তে ধোঁয়া উঠছে উজবেক ধাঁচের কাবাবের চুলায়, অন্য প্রান্তে কফিশপে পরিবেশন করা হচ্ছে লাতে, ক্যাপুচিনো কিংবা সল্টেড ক্যারামেল ফ্রস্টিনো। বেকারির শোকেসে সাজানো রুশ পেস্ট্রি, আর সুপারশপের তাকজুড়ে বিদেশি খাদ্যপণ্যের সমাহার।
ভাষা শেখার পেছনে অর্থনীতির পাঠ
সকালের বাজারে ফল বিক্রেতা লিটনের সঙ্গে কথা হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি দোকান খুলে বসেন রাতের শিফট শেষ করে ফেরা কর্মীদের জন্য।
দোকানের পাশে সাজানো ডিল, সেলারি, থাই বাসিল ও স্প্রিং অনিয়নের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “শুরুতে বিদেশিরা তাদের পছন্দের খাবার পেতেন না। পরে তারা বীজ নিয়ে এসে নিজেরা চাষ শুরু করেন। এখন এগুলো এখানেই উৎপাদন হয়।”
লিটনের ভাষায়, ব্যবসার প্রয়োজনে অনেক বিক্রেতাই রুশ ভাষার মৌলিক শব্দ শিখে নিয়েছেন। “যখন একজন ক্রেতা ‘কারতোশকা’ বলে আলু চান, তখন তো বুঝতেই হবে। ভাষা শিখতে হয়েছে ব্যবসার স্বার্থে,” বলেন তিনি।
এই বাজারে এখন বাংলা ও রুশ ভাষার মিশ্রণ একটি পরিচিত দৃশ্য। অনেক দোকানের সাইনবোর্ডেও দেখা যায় দুই ভাষার ব্যবহার।
বাজারের ভেতরে ছোট্ট এক পৃথিবী
রূপপুরের বাজারে হাঁটলে মনে হয় যেন ছোট্ট একটি আন্তর্জাতিক জনপদে ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে। শিশুদের হাসি, বিদেশি ক্রেতাদের ভিড়, নানা ভাষার কোলাহল আর মসলার গন্ধ মিলে তৈরি করে এক অনন্য পরিবেশ।
এখানে শুধু পণ্য কেনাবেচা হয় না; বিনিময় হয় গল্প, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতিরও।
একদিন বাজারে দেখা মিলল লাল পাগড়ি পরা এক ভবঘুরে বিক্রেতার। তিনি নিজেকে লালন শাহের অনুসারী বলে পরিচয় দিয়ে পুরোনো কয়েন বিক্রি করছিলেন। দাবি করছিলেন, সেগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের স্মারক। পরে জানা গেল, বেশিরভাগই মূল্যহীন ধাতব টুকরো। কিন্তু তার গল্প বলার ভঙ্গি, ভ্রমণের কাহিনি আর লোকজ রহস্যময়তা মুহূর্তেই ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছিল।
এই বাজারের সৌন্দর্য হয়তো সেখানেই—এখানে বাস্তবতা আর কল্পনা, বাণিজ্য আর গল্প একসঙ্গে মিশে যায়।
অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে পুরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। নতুন হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসেবা ও খুচরা ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা থেকে এসে ব্যবসা শুরু করা আমজাদ হোসেন বলেন, “বিদেশিদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আনতে হয়েছে। এখন এখানে এমন অনেক জিনিস পাওয়া যায়, যা আগে শুধু ঢাকার অভিজাত এলাকায় মিলত।”
তার মতে, প্রকল্পটি শুধু কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেনি, স্থানীয়দের আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
উৎসব, বন্ধুত্ব ও সহাবস্থান
গ্রিন সিটির জীবন শুধু কাজকেন্দ্রিক নয়। বিভিন্ন জাতীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবও এখানে নিয়মিত আয়োজন করা হয়।
রাশিয়ার জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিদেশি কর্মীদের ঐতিহ্যবাহী ‘খোরোভোদ’ নৃত্য এবং আধুনিক রুশ সংগীতের তালে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতে দেখা যায়। সেই আনন্দে অংশ নেন বাংলাদেশিরাও।
দূরদেশ থেকে আসা মানুষদের জন্য এটি হয়তো সাময়িক আবাসস্থল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের সম্পর্ক।
পরিবর্তনের প্রতীক
রূপপুর গ্রিন সিটি শুধু একটি আবাসন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল বাস্তবতার প্রতীক। এখানে পারমাণবিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় জীবনের স্রোত মিলেমিশে তৈরি করেছে নতুন এক সামাজিক ভূগোল।
একসময়ের নির্জন গ্রাম আজ বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের এক জীবন্ত উদাহরণ। যেখানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রুশ প্রকৌশলী আর বাংলাদেশি দোকানদার একই হাসিতে মেতে ওঠেন—আর সেখানেই ধরা পড়ে রূপপুরের আসল গল্প।

