সাবেক স্পিকার, সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই

আইন, রাজনীতি ও সংসদীয় গণতন্ত্রে রেখে গেলেন দীর্ঘ কর্মময় জীবনের স্মৃতি

প্রকাশিত: 7:31 PM, July 12, 2026 | আপডেট: 7:35:PM, July 12, 2026

 

ঢাকা, ১২ জুলাই : বাংলাদেশের রাজনীতি, আইন অঙ্গন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, সাবেক স্পিকার ও সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রোববার (১২ জুলাই) ভোরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আইনজীবী জীবনে তিনি দেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

 

 

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার (বর্তমান পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার) নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে উচ্চতর আইন শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যান এবং লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল হিসেবে সনদ লাভ করেন। দেশে ফিরে তিনি সাংবিধানিক, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিষয়ে একজন খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

 

রাজধানীতে বিশেষ অভিযানে ৫৮ জন গ্রেপ্তার, উদ্ধার অস্ত্র ও মাদক

 

 

রাজনীতিতে তাঁর পথচলা শুরু হলেও স্বাধীনতার পর তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

 

 

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দেন এবং সেখানে আইন বিষয়ক কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী কয়েক বছরও তিনি একই দায়িত্বে কাজ করেন। ১৯৮১ সালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কূটনৈতিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া, নিরস্ত্রীকরণসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন এবং নিরপেক্ষ জোটভুক্ত দেশগুলোর বিভিন্ন সম্মেলনেও অংশ নেন।

 

 

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা: ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের প্রস্তুতির কথা জানালেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

 

 

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯১ সালের উপনির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে এবং পরে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। সংসদে তিনি একজন অভিজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

 

 

২০০১ সালের নির্বাচনের পর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। স্পিকার হিসেবে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় নিরপেক্ষতা, সংসদীয় রীতি-নীতি অনুসরণ এবং কার্যকর বিতর্ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি প্রশংসিত হন। তাঁর সময়ে সংসদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন ও সাংবিধানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

 

 

২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই সময়ে তিনি দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

 

 

রাজনীতি ও আইন পেশার পাশাপাশি শিক্ষার প্রসারেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। নিজ জন্মস্থান পঞ্চগড়ে তিনি ‘ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষার উন্নয়ন, মেধাবী শিক্ষার্থী গড়ে তোলা এবং উত্তরাঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে তাঁর এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্র আইন, জাতিসংঘ, বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন, যা গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

 

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি আইনজ্ঞ, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, দক্ষ সংগঠক এবং অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতন থাকলেও দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার সবসময়ই আলোচিত হয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও গুরুত্ব পেয়েছে।

 

 

তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাঁর অবদান স্মরণ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তি এবং সামাজিক সংগঠন শোকবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংসদীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন।

 

 

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার তাঁর কর্ম, আদর্শ, সাংবিধানিক প্রজ্ঞা এবং শিক্ষা বিস্তারে অবদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকবেন। দেশের আইন, রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

 

 

এদিকে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিএনপির নেতারা এক শোকবার্তায় বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন দলের একজন অভিভাবকতুল্য নেতা, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে দলকে সাংগঠনিক ও নীতিগতভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর প্রজ্ঞা, সততা এবং সাংবিধানিক বিষয়ে গভীর জ্ঞান দল ও দেশের জন্য মূল্যবান সম্পদ ছিল।

 

 

সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও একজন অভিজ্ঞ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও তাঁর কর্মময় জীবনের প্রশংসা করে বলেন, তিনি ছিলেন সংলাপ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ একজন প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।