আগামী ২৪–৭২ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা, সতর্ক থাকার আহ্বান
টানা মৌসুমি বৃষ্টিপাত, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল
স্টাফ রিপোর্টার:
টানা মৌসুমি বৃষ্টিপাত, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের একাধিক জেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (FFWC)।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাংগু ও মাতামুহুরী নদীর পানি আগামী এক থেকে তিন দিনের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সাময়িক প্লাবন ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন দিনে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি সারি-গোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভোগাই নদীর পানিও দ্রুত বাড়বে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও আগামী ৭২ ঘণ্টায় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে।
টানা ভারী বৃষ্টিতে বাড়ছে ঝুঁকি
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে সিলেট ও বরিশাল বিভাগ এবং ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরা, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের উজান এলাকাতেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগামী চার দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। উজানের বৃষ্টির কারণে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি ও জনজীবনে প্রভাবের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তাহলে আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, মাছের ঘের এবং গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নিম্নাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আকস্মিক বন্যার কারণে অনেক পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে হতে পারে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে।
লঘুচাপের প্রভাব
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, ভারতের ওডিশা ও দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে অবস্থান করা মৌসুমি লঘুচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে বর্তমানে পূর্ব মধ্যপ্রদেশ এলাকায় একটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। তবে এর প্রভাবে বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প প্রবেশ করায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
সতর্ক থাকার আহ্বান
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র নদীসংলগ্ন ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত না করার, শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদ স্থানে রাখার, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ওষুধ মজুত রাখার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষ করে পাহাড়ি জেলা ও নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষকে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া ও নদীর পানির পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আগামী কয়েক দিনে নতুন সতর্কতা জারি করা হতে পারে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

