প্রকাশিত: ১১:২০ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২৬ | আপডেট: ১১:২০:পূর্বাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২৬
SHARES
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ঐতিহাসিক ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিয়েছে বলে দাবি করছে উভয় পক্ষ। চুক্তিটি ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে একটি চূড়ান্ত ও বিস্তৃত শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে।
মার্কিন প্রশাসনের প্রকাশিত খসড়া অনুযায়ী, চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ নিরসন এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা।
১৪ দফা চুক্তির প্রধান বিষয়গুলো
১. অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করা হবে। ২. উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করবে। ৩. ৬০ দিনের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে চূড়ান্ত শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। ৪. যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। ৫. ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ৬. ভবিষ্যতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তোলা হবে। ৭. যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সহায়তার নীতি গ্রহণ করবে। ৮. ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ও তহবিল ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হবে। ৯. ধাপে ধাপে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হবে। ১০. ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করবে। ১১. আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) তত্ত্বাবধানে পারমাণবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। ১২. সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৩. চুক্তি বাস্তবায়ন তদারকির জন্য যৌথ নির্বাহী ব্যবস্থা গঠন করা হবে। ১৪. চূড়ান্ত সমঝোতা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে।
অর্থনৈতিক সুবিধা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক চাপ কমানো। খসড়া অনুযায়ী, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে এবং স্থগিত থাকা সম্পদের একটি অংশ উন্মুক্ত করার পথ তৈরি হবে। পাশাপাশি ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নে শত শত বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে।
পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা
চুক্তিতে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে সম্মত না হলেও পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম পরিচালনা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরবর্তী আলোচনার পথ রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। তবে সমালোচকরা বলছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি রয়েছে।
সামনে কী?
চুক্তিটি আপাতত একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা। আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত সমাধান খোঁজা হবে। উভয় দেশই চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ১৪ দফা সমঝোতা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।