ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরান যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, তেলের দাম ৮০ ডলার ছুঁয়ে শেয়ারবাজারে পতন
হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্ব তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সঙ্গে ইউরোপ, এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি “শেষ” হয়ে গেছে। ন্যাটো সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করলেও ভবিষ্যতে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মূল কারণ ছিল ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুট বন্ধ বা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা বিশ্ববাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় অবরুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় এবং তেলের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।
তেলের দামে বড় উল্লম্ফন
-
আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০.১২ ডলারে পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমলেও তা উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করে।
-
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) তেলের দাম ৭.৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৫.৮৩ ডলারে ওঠে।
বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে পতন
তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে।
-
প্যারিস ও ফ্রাঙ্কফুর্টের শেয়ার সূচক ২ শতাংশের বেশি কমে দিনের লেনদেন শেষ করে।
-
লন্ডনের বাজার ১.৬ শতাংশ নিচে নামে।
-
ওয়াল স্ট্রিটে ডাও জোন্স সূচক ১.৬ শতাংশ কমে যায়, আর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক সূচক প্রায় ১ শতাংশ করে হ্রাস পায়।
আইজি প্ল্যাটফর্মের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বউচ্যাম্প বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা এবং ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অবরোধের সম্ভাবনা ইউরোপীয় বাজারে বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে, কারণ এসব বাজার উচ্চ জ্বালানি মূল্যের প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
এশিয়ার বাজারেও চাপ
এশিয়ার শেয়ারবাজারও এ ধাক্কা থেকে রেহাই পায়নি। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যোগ হয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে।
-
দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৫ শতাংশের বেশি পড়ে যায় এবং গত মাসের রেকর্ড উচ্চতার পর থেকে ২০ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে।
-
স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ার প্রায় ৬ শতাংশ করে কমে যায়, যদিও স্যামসাং শক্তিশালী এআই চিপের চাহিদার কারণে দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফা প্রায় ১৯ গুণ বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতামত
এক্সটিবি ট্রেডিং গ্রুপের গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকস বলেন, “ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে এবং তা বাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ।”
ফরেক্স ডটকমের বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, “বছরের প্রথমার্ধজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত এবং ট্রাম্পের নীতিগত পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীরা আর নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক সংকট চাইছিলেন না। কিন্তু পরিস্থিতি আবারও সেই দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ও সম্ভাব্য প্রভাব
সাম্প্রতিক হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে এবং ইরানি তেলের ওপর দেওয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ছাড়ও বাতিল করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও বাড়ানোর চাপের মুখে পড়তে পারে।
সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

