কুলাউড়ায় অবশেষে সরকারি বালু প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি হয় ১৬ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকায়

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জব্দকৃত ১৩ কোটি টাকা মূল্যের সেই বালুগুলো আইনী জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে নিলামকার্য সম্পন্ন করেছে উপজেলা প্রশাসন। ১৩ কোটি ৩৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকার সরকারি বালু প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি হয় ১৬ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকায়। উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতায় ও গণমাধ্যমের বড় ধরণের ভূমিকার কারণে একটি বালুখেকো সিন্ডিকেটের কবল থেকে বড় ধরণের রাজস্ব জমা হবে সরকারের কোষাগারে। উপজেলা প্রশাসনের এ নিলামকার্য বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে স্থানীয় এলাকায় বালু নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে দ্বন্ধের নিরসন হয়েছে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন থেকে কুলাউড়ার টিলাগাঁও ইউনিয়নের সালন, হাজীপুর ইউনিয়নের কনিমুড়া, হরিচক ও সাধনপুর নামক স্থানে ১৪৩০ বাংলা সনে মজুতকৃত মোট ২ কোটি ৯৬ লক্ষ ৪১ হাজার ১৯২ ঘনফুট উত্তোলিত বালু জব্দ করা হয়। যার সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৩৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৪ টাকা। গত ৬ আগস্ট মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে স্পট নিলামের মাধ্যমে জব্দকৃত বালু বিক্রয় করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়। ওই বালু নিলামের জন্য গত ১৪ আগস্ট বিজ্ঞপ্তি দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন। কিন্তু ওই বালু নিজেদের মহালের দাবি করে করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং-১১৯৪৬ দায়ের করেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাসিন্দা মনু নদীর বালুমহালের বর্তমান ইজারাদার নাজমুন নাহার লিপি। হাইকোর্টে সেই রিট নিষ্পত্তি না হওয়ায় বালু নিলাম কার্যক্রম স্থগিত করতে বালু মহালের ইজারাদারের পক্ষে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ও কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোঃ মোশতাক আহমেদ। পরে গত ১৭ আগস্ট বালুর নিলাম কার্য স্থগিতের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মহিউদ্দিন। পরবর্তীতে আইনী জটিলতা নিরসন করে গত ২৭ আগস্ট বিকেলে ফের বালু নিলামের বিজ্ঞপ্তি দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বালু নিলাম কমিটির আহবায়ক মো. মহিউদ্দিন। এর আগে স্থানীয় লোকজনের বিভিন্ন অভিযোগ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের নির্দেশে জমাটকৃত বালুর স্তুপ চিহ্নিত করে গত জুলাই মাসের প্রথম দিকে কয়েক কোটি ঘনফুট বালু জব্দ করেন হাজীপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মতিউর রহমান।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রবিবার (৩১ আগস্ট) প্রথমে সকাল ১১টায় উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের সালন এলাকায় জব্দ করা ১ কোটি ৬২ লক্ষ ১৩ হাজার ৬৮০ ঘনফুট বালু নিলাম করা হয়। ওই বালুর সরকারি মূল্য ধরা হয় ৭ কোটি ২৯ লক্ষ ৬১ হাজার ৫৬০ টাকা। প্রকাশ্য নিলামে ওই বালু সর্বোচ্চ ৮ কোটি ১২ লক্ষ টাকা দিয়ে নিলামে নেন কুলাউড়ার পৃথিমপাশার দীপক দে। দ্বিতীয় নিলামকারী হন সুনামগঞ্জের সৌরভ রায়। দুপুর সাড়ে ১২টায় হাজীপুর ইউনিয়নের কনিমুড়া এলাকায় জব্দ করা ৭৯ হাজার ৫০ ঘনফুট বালুর নিলাম করা হয়। ওই বালুর সরকারি মূল্য ধরা হয় ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭২৫ টাকা। সর্বোচ্চ ১১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ওই বালু নিলামে নেন শ্রীমঙ্গলের মো. সেলিম মিয়া। দুপুর দেড়টায় হাজীপুর ইউনিয়নের হরিচক এলাকায় ১ কোটি ২৯ লক্ষ ৮৬ হাজার ৯৩২ ঘনফুট বালু নিলাম করা হয়। ওই বালুর সরকারি মূল্য ধরা হয় ৫ কোটি ৮৪ লক্ষ ৪১ হাজার ১৯৪ টাকা। সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা দিয়ে ওই বালু নিলামে নেন সুনামগঞ্জের সৌরভ রায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিলামকারী হন দীপক দে। দুপুর আড়াইটায় হাজীপুর ইউনিয়নের সাধনপুর এলাকায় ৩ লক্ষ ৬১ হাজার ৫৩০ ঘনফুট বালু নিলাম দেয়া হয়। ওই বালুর সরকারি মূল্য ধরা হয় ১৬ লক্ষ ২৬ হাজার ৮৮৫ টাকা। সর্বোচ্চ ৭১ লক্ষ টাকা দিয়ে ওই বালু নিলামে নেন পৃথিমপাশার দীপক দে।
নিলাম কার্য বাস্তবায়নের সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বালু নিলাম কমিটির আহবায়ক মো. মহিউদ্দিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আনিসুল ইসলাম, উপজেলা প্রকৌশলী প্রীতম সিকদার জয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আল-আমিন সরকার ও জসিম উদ্দিন, হাজীপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নূর আহমদ চৌধুরী বুলবুল প্রমুখ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, অনেক সুশৃঙ্খল ও শান্ত পরিবেশে কুলাউড়ার চারটি স্থানে প্রকাশ্য বালুর নিলাম কার্য সম্পন্ন করা হয়। আইনি জটিলতা নিরসন করে ওই বালু নিলামের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল। প্রকাশ্য নিলামে প্রায় শতাধিক নিলামকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সার্বিক সহযোগিতায় ছিল। তিনি আরো বলেন, চারটি স্থানে ২ কোটি ৯৬ লক্ষ ৪১ হাজার ১৯২ ঘনফুট বালুর সরকারি ভিত্তিমূল্য ধরা হয় ১৩ কোটি ৩৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৪ টাকা। প্রকাশ্য নিলামে সেটি ১৬ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকায় নিলাম হয়। এতে সরকারের কোষাগারে মোটা অংকের রাজস্ব জমা হবে।