নিজস্ব প্রতিবেদক
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে মুঘল সাম্রাজ্যকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও ভুল ধারণা আজও বিদ্যমান। অনেক সময় এই সময়কালকে কেবল ধর্মীয় সংঘাতের ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ বাস্তবে মুঘল শাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন কিছু রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল, যা বহু ধর্ম, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে ‘সুলহ-ই-কুল’ বা ‘সবার সঙ্গে শান্তি’ ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্রাট আকবর এবং যুবরাজ দারা শিকোহ—দুজনেই এই আদর্শকে সমর্থন করলেও তাদের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সম্রাট আকবরের কাছে ‘সুলহ-ই-কুল’ ছিল মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একজন শাসকের দায়িত্ব হলো ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব প্রজার প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো একটি ধর্মকে বিশেষ সুবিধা না দিয়ে যোগ্যতা ও আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এর ফলে মুসলিম, হিন্দু, জৈন, খ্রিস্টান, জরথুস্ত্রীসহ নানা সম্প্রদায়ের মানুষ মুঘল প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পেরেছিলেন।
আকবরের এই নীতি সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত যুগান্তকারী। সমসাময়িক অনেক বিদেশি পর্যবেক্ষকও উল্লেখ করেছেন যে, তিনি কোনো একক ধর্মীয় মতবাদকে রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেননি। তাঁর দৃষ্টিতে অতিরিক্ত ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা মানুষের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই তিনি ধর্মীয় আচার পালনের চেয়ে মানুষের নৈতিকতা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ফের তীব্র হামলা, কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণে হতাহত
অন্যদিকে যুবরাজ দারা শিকোহ একই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যান। তিনি রাজনৈতিক শাসনের পরিবর্তে আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক সত্য অনুসন্ধানে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোর মৌলিক শিক্ষা ভিন্ন নয়; ভাষা, সংস্কৃতি ও আচার-অনুষ্ঠানের পার্থক্য থাকলেও তাদের অন্তর্নিহিত সত্য এক ও অভিন্ন।
দারা শিকোহ সুফিবাদের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন এবং পরে ভারতীয় দর্শন, বিশেষ করে বেদান্তের প্রতি গভীর আগ্রহী হন। তিনি ইসলামি সুফিবাদ ও হিন্দু বেদান্ত দর্শনের মধ্যে বহু মিল খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মাজমা-উল-বাহরাইন (দুই সাগরের মিলন)-এ তিনি দেখানোর চেষ্টা করেন যে, দুটি ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্য একই আধ্যাত্মিক সত্যের দিকে মানুষকে পরিচালিত করে।
এরপর তিনি বারাণসীর পণ্ডিতদের সহযোগিতায় উপনিষদগুলো ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম পণ্ডিতদের ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করা এবং বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা।
ঐতিহাসিকদের মতে, আকবরের নীতি প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হয়ে দীর্ঘদিন কার্যকর ছিল, কারণ এটি একটি বহুধর্মীয় সাম্রাজ্য পরিচালনার বাস্তব প্রয়োজন পূরণ করেছিল। কিন্তু দারা শিকোহের চিন্তাধারা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল। তাঁর দর্শন পরবর্তী সময়ে বহু গবেষক ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে তা তাঁকে সফল করতে পারেনি।
ইতিহাসে দারা শিকোহকে অনেক সময় কেবল উদারপন্থী রাজপুত্র হিসেবে স্মরণ করা হয়। তবে গবেষকদের মতে, তাঁর প্রকৃত অবদান ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে মিল খুঁজে বের করার আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণ। অন্যদিকে আকবর দেখিয়েছিলেন কীভাবে একটি বৈচিত্র্যময় সমাজকে ন্যায়, সমতা ও সহনশীলতার মাধ্যমে পরিচালনা করা যায়।
বর্তমান সময়ে যখন ধর্মীয় বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে, তখন আকবর ও দারা শিকোহের ‘সুলহ-ই-কুল’ ধারণা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একজন শাসনের মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে ধারণ করার পথ দেখিয়েছেন, আর অন্যজন বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত অভিন্ন মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অবলম্বনে প্রস্তুত।

