মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য প্রতিদিন বরাদ্দ ৮টি ফ্রি সিগারেট!
ব্রিটিশ আমলের অদ্ভুত নিয়ম এখনও চালু বাংলাদেশের কারাগারে
আদালতের কাঠগড়া শান্ত হওয়ার পর যখন কোনো আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে শুরু হয় এক অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী আনুষ্ঠানিকতা। দেশের প্রতিটি কনডেমড সেলে (ফাঁসির আসামিদের সেল) থাকা বন্দিরা প্রতিদিন সরকারি খরচে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ৮টি করে সিগারেট পান। ব্রিটিশ আমলের পুরনো ‘জেল কোড’ বা কারা বিধির একটি নিয়মের কারণে শত বছর ধরে এই ব্যবস্থা চলে আসছে।
দ্য জেল কোড-এর ধারা ৯৮৯-এর একটি অংশে বলা হয়েছে: “ধূমপায়ী কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে সিগারেট বা তামাক সরবরাহ করা যেতে পারে।”
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) এবং মুখপাত্র জান্নাত-উল-ফরহাদ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, “এই নিয়মটি কারা বিধিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে এবং এটি এখনও নিয়মিত পালন করা হয়। আমরা প্রতিটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে প্রতিদিন ৮টি করে সিগারেট দিয়ে থাকি।”
বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় ১০০ জন নারীসহ ২ হাজারেরও বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। সেই হিসাবে প্রতিদিন কারাগারের ভেতরে সরকারি উদ্যোগে প্রায় ১৬ হাজার সিগারেট বিতরণ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কারা কর্মকর্তা জানান, “এই নিয়মের পেছনের মূল ভাবনাটি ছিল—জীবনের শেষ দিনগুলোতে থাকা বন্দিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে কিছুটা স্বস্তি বা মানসিক আরাম দেওয়া।” যদিও এই ২ হাজার বন্দির মধ্যে মাত্র কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, বাকিদের আপিল ও আইনি জটিলতার কারণে বছরের পর বছর কনডেমড সেলে অপেক্ষা করতে হয়। তবে ফাঁসি হোক বা না হোক, প্রতিদিনের সিগারেটের এই কোটা কখনোই বন্ধ হয় না।
কারাগারের ভেতরে সিগারেটই ‘টাকা’ বা মুদ্রা: কারা কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত ডার্বি, পাইলট বা হলিউডের মতো স্থানীয় ব্র্যান্ডের সিগারেট প্রতিদিন সকালে বা দুপুরে বন্দিদের মাঝে বিতরণ করা হয়। তবে এই নিয়মের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—সব ফাঁসির আসামিই ধূমপায়ী নন।
যারা ধূমপান করেন না, তারা এই সিগারেটগুলো জমিয়ে রাখেন। সারা বিশ্বের কারাগারগুলোর মতোই বাংলাদেশের কারাগারেও সিগারেট একটি শক্তিশালী ‘মুদ্রা’ বা কারেন্সি হিসেবে কাজ করে। অধূমপায়ী বন্দিরা প্রতিদিনের সিগারেটগুলো না নিয়ে, যখন তা জমতে জমতে একটি পূর্ণ প্যাকেটে পরিণত হয়, তখন তা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে কারাগারের ভেতরে অন্যান্য বন্দিদের কাছে চড়া দামে এই প্যাকেটগুলো বিক্রি করা হয়, অথবা এর বিনিময়ে ভালো খাবার, বিশেষ সুবিধা বা অন্য কোনো অনানুষ্ঠানিক সেবা গ্রহণ করা হয়।
নিরাপত্তার কড়াকড়ি: নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আলাদা সেলে রাখার কথা থাকলেও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি থাকায় অনেক সময় এক সেলে একাধিক জনকে থাকতে হয়। এই বন্দিরা সিগারেট পেলেও নিজেদের কাছে দিয়াশলাই বা লাইটার রাখার অনুমতি নেই। যখনই তাদের ধূমপানের ইচ্ছা হয়, তারা দায়িত্বরত কারারক্ষীদের ডাকেন। রক্ষীরাই এসে তাদের সিগারেট জ্বালিয়ে দিয়ে যান। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তার স্বার্থেই কনডেমড সেলে লাইটার রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ফ্রি সিগারেট ছাড়াও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা বই, সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন পড়ার সুযোগ পান। প্রতিদিন গোসল বা সামান্য হাঁটাচলার জন্য তাদের এক থেকে দুই ঘণ্টা সেলের বাইরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তারা তাদের নির্দিষ্ট ব্লক বা জোনের বাইরে যেতে পারেন না।
এছাড়াও সাধারণ বন্দি বা বিচারাধীন আসামিরা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে বাইরের পিসি (প্রিজনার্স ক্যাশ) অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিয়ে বা জেলের ভেতরের ক্যানটিন থেকে নিজস্ব খরচে সিগারেট কিনতে পারেন। তবে কনডেমড সেলের বন্দিদের জন্য এই ৮টি সিগারেট পুরোপুরি বিনামূল্যে এবং রাষ্ট্রীয় বরাদ্দে দেওয়া হয়।

