রেলস্টেশনের পুরোনো বেঞ্চটায় বসে ছিল নীলা। হাতে ছোট্ট একটি ডায়েরি। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“যদি কোনোদিন ফিরে আসো, আমি এখানেই অপেক্ষা করব।”
আজ ঠিক সাত বছর হয়ে গেল।
সাত বছর আগে এই স্টেশনেই বিদায় নিয়েছিল আরাফ ও নীলা। উচ্চশিক্ষার জন্য আরাফ বিদেশে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে সে বলেছিল, “আমি ফিরে আসব। শুধু আমার জন্য অপেক্ষা করবে?”
নীলা মুচকি হেসে বলেছিল, “অপেক্ষা যদি ভালোবাসার আরেক নাম হয়, তাহলে আমি সারাজীবন অপেক্ষা করব।”
প্রথম কয়েক বছর নিয়মিত কথা হতো। ভিডিও কল, বার্তা, জন্মদিনের শুভেচ্ছা—সবই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে দূরত্ব শুধু কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ থাকল না; ব্যস্ততা, সময়ের পার্থক্য আর জীবনের দৌড় তাদের কথোপকথন কমিয়ে দিল।
একদিন হঠাৎ করেই আরাফের কোনো খবর পাওয়া গেল না।
ফোন বন্ধ।
ই-মেইলের উত্তর নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কোনো খোঁজ নেই।
অনেকে বলেছিল, “ভুলে যাও। ও আর ফিরবে না।”
কিন্তু নীলা বিশ্বাস করত, সব গল্পের শেষ একই রকম হয় না।
প্রতি বছরের এই দিনে সে একই স্টেশনে এসে বসত। কিছুক্ষণ ট্রেনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকত, তারপর চুপচাপ ফিরে যেত।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
সন্ধ্যার ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল। যাত্রীরা একজন একজন করে নামছে। নীলা অভ্যাসবশত একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল।
ঠিক তখনই একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
“এখনও কি অপেক্ষা করছ?”
নীলা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরাফ।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, মুখে হালকা দাড়ি, কিন্তু সেই হাসিটা একটুও বদলায়নি।
নীলা কিছু বলতে পারছিল না। শুধু চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।
আরাফ এগিয়ে এসে বলল, “আমি জানি, আমার অনেক আগে ফিরে আসা উচিত ছিল। কিন্তু একটা দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলাম। তারপর নতুন করে জীবন শুরু করতে সময় লেগেছে। তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করার সব উপায় হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
নীলা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে এত দিন পর কেন এলে?”
আরাফ পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল। ছবিটিতে তারা দুজন এই স্টেশনেই দাঁড়িয়ে ছিল।
সে বলল, “কারণ আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেটা ভাঙতে পারিনি।”
দুজনের মাঝখানে দীর্ঘ সাত বছরের নীরবতা দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেই নীরবতাকে ভেঙে দিল একটি সহজ প্রশ্ন।
“আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”
নীলা উত্তর দিল না।
সে শুধু আরাফের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
আরাফ সেই হাত শক্ত করে ধরল।
স্টেশনের লাউডস্পিকারে আরেকটি ট্রেনের আগমনের ঘোষণা ভেসে এলো। চারদিকে মানুষের ভিড়, কোলাহল, ব্যস্ততা। অথচ তাদের কাছে সময় যেন থেমে গেছে।
নীলা হেসে বলল, “জানো, মানুষ বলে অপেক্ষা খুব কষ্টের।”
আরাফ মৃদু হেসে উত্তর দিল, “হয়তো। কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো সময়ের কাছে হেরে যায় না।”
দুজন ধীরে ধীরে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল। আকাশে তখন সন্ধ্যার শেষ আলো। সাত বছরের অপেক্ষা শেষ হয়ে নতুন এক পথচলার শুরু হলো।
কিছু প্রতিশ্রুতি সময়কে হারিয়ে দেয়। আর কিছু ভালোবাসা দূরত্বকে নয়, বরং ধৈর্যকে জয় করে।
