ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত আদ-দিন হাসপাতালে রহস্যজনকভাবে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার ভোরে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে একের পর এক নবজাতকের মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, কোনো কারিগরি ত্রুটি বা কক্ষের পরিবেশগত সমস্যার কারণেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, রাত প্রায় ২টার দিকে পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে থাকা এক অভিভাবক অভিযোগ করেন যে নবজাতকদের শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ পাওয়ার পর কক্ষটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) প্রায় এক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়।
তিনি আরও জানান, ভোর ৪টার দিকে একটি নবজাতকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)-তে নেওয়া হয়। সেখানে কিছুটা উন্নতি দেখা দিলে প্রায় আধা ঘণ্টা পর শিশুটিকে আবার পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু সকাল ৬টার দিকে এক নার্স একটি শিশুকে নিস্তেজ অবস্থায় দেখতে পান। এরপর দ্রুত তাকে এনআইসিইউতে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য নবজাতকদের অবস্থারও দ্রুত অবনতি ঘটে। একে একে তাদের সবাইকে এনআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তবে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও এক থেকে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। মৃত শিশুদের সবার বয়স ছিল এক থেকে তিন দিনের মধ্যে।
অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা মনে করছি না যে চিকিৎসাজনিত জটিলতার কারণে এই মৃত্যু হয়েছে। হঠাৎ করে একই কক্ষে থাকা ছয় নবজাতকের মৃত্যু অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কোনো কারিগরি ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত সমস্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
ঘটনার পর হাসপাতালের ওই পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো ওয়ার্ডের পরিবেশ, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে।
এদিকে ঘটনার তদন্তে মাঠে নেমেছে সিআইডি। সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সন্দেহ করছি, পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে কোনো কিছুর কারণে নবজাতকদের শ্বাসরোধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেটি গ্যাস, অক্সিজেন লাইনের ত্রুটি নাকি অন্য কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা—সবকিছু তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
ঘটনার পর হাসপাতালজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। অনেক অভিভাবক হাসপাতালের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

